কুমিরের বাচ্চা টিকটিকি

তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী

১.

রাত প্রায় বারোটা। আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ জ্বলছে। কেন্দ্রীয় দাখিল পরীক্ষা চলমান। পুরো দু’বছর পড়ালেখার ধার ধারিনি। তাই এখন মারাত্মক লেভেলের পড়ালেখা চলছে। খোলা জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। কিছুক্ষণ পরেই কপালটা টেবিলে ঠুকলো। উহ! টেবিলের নিচে মশাগুলো সব তুফান করে ফেলছে। গতবার একুশটা মশা মেরে সেগুলোর ছবি তুলে রেখেছিলাম। এরপরেও তাদের আক্কেল হয়নি! পা নাড়াতে গিয়ে মেঝেতে পা পড়তেই চমকে উঠি। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর অন্ধবধূ কবিতাটা মনে পড়ল—

 “পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী!

আস্তে একটু চলো না ঠাকুর-ঝি”

টেবিলের তলায় মাথা ঢুকাতেই তো চোখ কপালে। রাশি রাশি ক্ষুদ্র সাদা ডিম। কিসের ডিম এগুলো? এমন সাদা দানার মতো চকো-বিন তো বাজারে পাওয়া যায়। সেগুলোকে আমরা টিকটিকির ডিম বলে থাকি। কিন্তু এগুলো কিসের ডিম?! গুণে দেখি আঠারোটা ডিম। চেয়ার থেকে নেমে গেলাম। ভালোভাবে ঝুঁকে খেয়াল করতেই দেখি– ডিমগুলোর উপর সূক্ষ্ম কালো আঁচড়ের দাগ। কিছুটা বর্ণমালার মতোও দেখাচ্ছে। খাতার একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সবগুলো ডিম খুব সাবধানে তুলে টেবিলে তুলে আনলাম। এবার ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে শুরু করলাম গো-যোগ-এষণা, মানে গবেষণা। আধঘণ্টার ঘাম-ঝরানো পরিশ্রমের পর বুঝলাম– এটা ওরই কাজ হবে।

কালো আঁচড়গুলো নিছক আঁচড় নয়। এগুলো একেকটা জ্বলজ্যান্ত অক্ষর। আর ডিমগুলো যেন তার খাতা। একটা ডিমে কয়েকটি করে শব্দ। আমি এবার পড়তে শুরু করলাম–

“প্রিয়” পড়েই প্রথমে এক ধাক্কা খেলাম। একটু সামলে আবার শুরু করলাম,

“তোমাকে তো আমি আগেও বলেছি যে আমি আসলে টিকটিকি নই। ভাগ্যচক্রে কুমির থেকে টিকটিকি হয়ে গেছি। আর কয়েক বছর পরে আমাকে আবার আগের রূপে ফিরতে হবে। আমি চাই তখন তুমি আমাকে তোমাদের দিঘিটাতে আশ্রয় দাও। যাদের বাসায় থাকি তাদের কোনো দিঘি নেই। প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে দিও না। 

ইতি,

তোমার টিকটিকিরূপী 

অভাগী কুমির”

২. 

বছর কয়েক আগে একদিন বিরতির সময় ক্লাসরুমে বসে টিফিন খাচ্ছি। বাইরে কাঠফাটা রোদে মাঠ ফেটে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর নাকি শীতকাল আসবে! মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে তবু দরদর করে ঘাম নির্গত হচ্ছে। রুমে আর কেউ নেই। হঠাৎ দেখি কোত্থেকে একটা কালচে-ধূসর টিকটিকি এসে পড়ল আমার টেবিলে। আমি তো লাফ দিয়ে উঠলাম। এরপর যখন টিকটিকিটা স্পষ্টভাবে কথা বলতে শুরু করল তখন তো পুরাই মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়! 

“ভয় পেও না! আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। আর আমি আসলে টিকটিকি নই”

আমি ছয় ইঞ্চির টিকটিকিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ঘোর কেটে গেলে পকেট থেকে টেনিস বলটা বুকে রেখে সাহস করে বললাম, “কে তুমি? কী চাই আমার কাছে?”

টিকটিকিটা বলল:

“আমি আসলে একটা কুমির। আমার বাবা আমাদের সাত ভাইবোনকে শিয়াল পণ্ডিতের কাছে পড়ালেখা শেখার জন্য দিয়েছিলেন। শিয়াল পণ্ডিত আমাদের সবাইকে একে একে খেতে লাগল। আমি আর কোনো উপায় না দেখে কৌশলে তার আস্তানা থেকে পালালাম। সবাই জানে শিয়াল পণ্ডিত আমাদের সবাইকে খেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সে আমাকে খেতে পারেনি। তো এরপর চিন্তা করলাম যাবো কোথায়? পানিতে নামলে তো বাবা পড়াচোর বলে তাড়িয়ে দেবেন । তাই স্বভাববিরুদ্ধ হলেও দ্রুত একটা গাছের ফাটলে ঢুকে পড়লাম। কিন্তু সেটা ছিল পেঁচা মশাইয়ের ঘর। তিনি তখন চোখে চশমা এঁটে পড়ছেন। আমাকে দেখে ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। আমার কোনো কথা না শুনেই আমাকে মন্ত্র পড়ে আমার গায়ে ফুঁ দিয়ে দিলেন: 

“ছু মন্তর ছু, তুই টিকটিকি হয়ে যা ফুঁ” 

আর অমনি আমি কুমির থেকে টিকটিকি হয়ে গেলাম। টিকটিকি হয়ে যাওয়ার পর আমি কেঁদে-কেটে তার কাছে সব খুলে বললাম। তখন তিনি বললেন, ‘ও, এই ব্যাপার। কিন্তু কী আর করার! আমি তো মন্ত্র পড়ে ফেলেছি। এই মন্ত্র এক যুগের আগে ভাঙবে না। ততদিন বরং কোনো মানুষের বাসার কোণে গিয়ে থাক। আর শোন, এই কয়েক বছর বসে না থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ালেখা শিখে নিস’

আমি অনেক খুঁজেটুজে একজন ভালো মানুষের বাসায় গিয়ে উঠলাম। কিন্তু তাদের ছেলেটা একদিন আমাকে মারতে উদ্যত হয়। কোনরকমে বেঁচে ফিরে পরে আরেক বাসায় গিয়ে উঠলাম। এখন তাদের খাটের নিচে থাকি। আর প্রতিদিন তোমাদের এই মাদ্রাসায় এসে পড়ালেখা করি। ঐযে ডানের ঐ লাইটটার পাশে আমি বসে থাকি। পড়ালেখাও হয়, আবার পোকামাকড়ও খেতে পারি।”

আমার কিন্তু টিকটিকিটার কথা একটুও বিশ্বাস হলো না। কারণ এই গল্পটা আমি শুনেছি। এই টিকটিকিটা যে বানিয়ে বানিয়ে বলছে না তার কী প্রমাণ?! আমি দ্রুত একটা বই নিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলাম। অবশ্য মনে মনে একবার ভেবেছিলাম টিকটিকিটাকে মেরেই ফেলি। কারণ একদিন আমাদের হাদিসের উস্তাদ বলেছিলেন, “আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের অবহিত করেছেন যে, ইবরাহিম (আঃ)-কে যখন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হলো তখন পৃথিবীর বুকে এমন কোন প্রাণী ছিল না, যা আগুন নিভাতে চেষ্টা করেনি, টিকটিকি ব্যতীত। সে বরং আগুনে ফুঁ দিয়েছিলো। তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটিকে হত্যার নির্দেশ দেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩২৩১)

তার ওপর টিকটিকি আমার এমনিতেই খুব একটা পছন্দের প্রাণী নয়। কিন্তু ঐ টিকটিকিটা এরপরেও কয়েকবার বিরতির সময় আমার টেবিলে উঠে এসেছে। আমি তার সাথে কোনো কথাই বলিনি। না জানি কত লোকের সাদা পাঞ্জাবি সে নষ্ট করেছে—কে জানে!

অবশ্য তার প্রতি যে আমার অন্তরে একটা গুপ্ত অজানা সহানুভূতি জন্মেছে তা খেয়াল করছি। প্রায়ই আমি ক্লাসে লাইটের দিকে তাকালে তার গোবেচারা বিষণ্ন মুখটা চোখে পড়ে। সে মনোযোগ দিয়ে উস্তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুদিন পর আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হলো। পরীক্ষার পর বাবা আমাকে নতুন ক্লাসে নতুন মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে তার মুখে যেন কালি পড়ল। গম্ভীরভাবে বললেন, “মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা কর। ভালো রেজাল্ট করতে হবে”

বুঝলাম– নিশ্চয়ই মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের সাথে কোনো কিছু একটা নিয়ে রেষারেষি হয়েছে।

এরপর আর কোনোদিন টিকটিকিটার কোনো খোঁজ মেলেনি। মাঝে মাঝে আমি ভাবি– সে এখন কোথায়? কী করছে? সে যা বলেছিল তা কি আসলে সত্য?

৩.

পূর্বাকাশে মেহেদীর মতো লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে। মেঘেরা পাহাড়ের মতো জমাট বেঁধে আছে৷ সবুজ গাছপালা ছাওয়া এলাকার পথ বেয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে যাচ্ছি। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশ চারপাশে বিরাজমান। ঘরে ঢুকে তাড়াতাড়ি পড়তে বসলাম। কিন্তু পড়া তো মাথায় ঢুকছে না। গতকাল রাতের ছোট ছোট ডিমগুলো আমার ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু বস্তুত তারা আমার মাথায় ঢুকে বসে আছে। কবি আল মাহমুদ বলেছিলেন–

“আম্মু বলেন পড় রে সোনা

আব্বু বলেন মন দে,

পাঠে আমার মন বসে না

কাঁঠালচাপার গন্ধে”

কিন্তু আমার তো টিকটিকির ডিমের বিশ্রী গন্ধেই পাঠে মন বসছে না। কোনোরকমে শুধু বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে পরীক্ষার হলে চলে গেলাম। প্রশ্ন মোটামুটি সহজ হয়েছে, তাই লিখতে তেমন অসুবিধা হলো না। রাতে আবার বসলাম ডিমগুলো নিয়ে। একটু নাড়াচাড়া করে এরপর কাগজ কলম টেনে নিলাম লিখতে শুরু করি–

“তোমার চিঠি পড়েছি। তুমি যা চাচ্ছো তা আমার মনে হয় সম্ভব না। কারণ আগামী বছর ভাইয়ার মাস্টার্স শেষ হলে তাকে বাবা একটা কুমির কিনে দেবেন। আমার বাবার এই বাতিক আছে। কুমির নাকি বর্তমানে বিপন্ন প্রাণী। তাই উনি পরিবেশ রক্ষার্থে তাঁর কোন এক বন্ধুর কাছ থেকে কুমির এনে দিঘিতে পুষবেন। আমার মাস্টার্স শেষ হলে আমাকেও একটা কুমিরের দায়িত্বে ছেড়ে দেবেন বলেছেন। এখানে আমার হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার নেই। তবে তোমার প্রতি আমার বোধহয় একটা টান আছে। কী জানি! তোমার সাথে যখন কথা হতো না, তখন মনটা কেমন কেমন করতো! আচ্ছা, তুমি কেন এতো মানুষ থাকতে আমার পেছনে লেগেছো, বলবে?”

এরপর ড্রয়ার থেকে সাবধানে কাগজসহ ডিমগুলো বের করলাম। ডিমগুলোকে আমার লেখা কাগজের উপর এনে রেখে ডিমসমেত কাগজটা টেবিলের নিচে রেখে দিলাম। আগামীকালকে পরীক্ষা না থাকায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম যাতে ভোরে সকাল সকাল উঠতে পারি। নইলে আমাকে জাগাতে এসে যদি মা ডিমগুলো দেখে তাহলে হয় উনি হার্টফেল করবেন, আর না হয় আমার হার্টফেল করিয়ে ছাড়বেন।

৪. 

“প্রিয়, 

তুমি আমাকে তোমাদের দিঘিতে আশ্রয় দিবে কিনা সেটা তোমার নিজস্ব ব্যাপার। তবে কুমির হওয়ার পর আমি আর অন্য কোনো মানুষের আশ্রয়ে থাকবো না। তুমি যদি জায়গা না দাও তো তবে আমি মেঘনা নদীতে চলে যাবো৷ সেখানে একলা থাকবো। তবু তোমাকে ছাড়া অন্য কারো আশ্রয় গ্রহণ করবো না। কেন? সেটা আমি নিজেও জানি না। জাস্ট তোমাকে আমার ভালো লাগে। তুমি যদি আমাকে দিঘিতে আশ্রয় দাও, তো তোমাকে পিঠে করে নিয়ে আমি আমার জন্মস্থান সুন্দরবনটা দেখিয়ে আনবো। সেখানে গরান, কেওড়া, সুন্দরী গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছুটে চলা হরিণীদের দেখি মুগ্ধ হয়ে যাবে। এছাড়াও আরো অনেক জায়গায় নিয়ে যাবো। কিন্তু তুমি যদি তোমাদের দিঘিতে আশ্রয় না দাও, তাহলে আমার আর কী করার আছে!

ইতি,

তোমার টিকটিকিরূপী

হতভাগী কুমির”

এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করলাম। আমি একটা বিষয় খেয়াল করেছি, অন্য সময় যেখানে আমাকে জাগাতে গিয়ে মায়ের কোমর ধরে যায়, সেখানে পরীক্ষার সময় মোবাইলের অ্যালার্ম বাজার সাথে সাথেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে উঠে অজু করে এসেই টেবিলের নিচে তাকিয়ে দেখলাম আমার কাগজটা নেই। গুণে দেখলাম এবার ছাব্বিশটা ডিম। এরপর সেগুলোতে থাকা আঁচড়গুলো অর্থ উদ্ধার করলাম। এখন ভাবছি আমার কী করণীয়?! তাকে আমাদের দিঘিতে আনা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এবার অন্যপ্রসঙ্গে যাওয়ার জন্য তার কী অবস্থা– সেটা জানতে চাইলাম। 

বেশ কয়েকদিন চিঠি চালাচালির পর বুঝলাম– আমি চলে যাওয়ার পর সে এক বছর আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু আমি আর আসছি না দেখে পরে অন্য একটা স্কুলে চলে যায়। আর সে যেই বাসায় থাকে, সেটা আমার এক ক্লাসমেটের বাসার কাছেই। ক্লাসমেটটার নাম যেন কী– ও, না থাক। নাম বললে আবার চাকরি থাকবে না।

আর আমার বাড়ির ঠিকানা কীভাবে পেল সেটা জিজ্ঞেস করলে বলল, “তোমার ক্লাসমেটের উপর গোয়েন্দাগিরি করে…”

কিন্তু এই চিঠি চালাচালির উৎপাতে আমার পড়ালেখার তেরোটা বেজে গেছে। ঐদিকে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে পরীক্ষার হলে ঘাড়ের উপর খাঁড়ার মতো সিসি ক্যামেরা ঝুলছে। যার ফলে একটু নকলও করা যাচ্ছে না। শেষমেশ একদিন তাকে চিঠি লিখলাম—

“আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে আর ডিস্টার্ব করো না। আমার এখন পরীক্ষা চলছে। তার উপর তুমি টিকটিকি, যাকে ইসলামে মারার হুকুম আছে। পরীক্ষার পরে দরকার হলে চিঠি দিও”

পরদিন ভোরে ডিমগুলো পরীক্ষা করে দেখি–

“ঠিক আছে। এখন আর চিঠি দিবো না। যদি আল্লাহ সুযোগ করে দেন, তো তবে তোমাদের দিঘিতে কুমির হয়ে আসার পর কথা হবে।”

আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দুই বিষয়ের পরীক্ষা বাকি আছে সেগুলো ভালোভাবে দিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খচখচানি রয়েই গেল।

৫.

ক্লান্ত বিকেলের শান্ত আকাশ। এক টুকরোও মেঘ নেই। দিঘির ঘাটে বসে আছি। এই দিঘিটা নাকি আমার পরদাদার আমলের। দিঘিটা বেশ বড় ও গভীর। বাতাসের টানে দিঘির পানিতে হালকা ঢেউ উঠছে। রোদের পরশে ঢেউগুলো বালুর মতো চিকচিক করছে। গতকাল আমাদের দাখিল পরীক্ষার রেজাল্টের তারিখ আটাশ জুলাই থেকে আবার পিছিয়ে দশ আগস্ট করা হলে মনটাই বিগড়ে গেল। আমার বিশেষ বন্ধুটন্ধুও নাই। কাজী নজরুল যেমন নিজের একাকিত্ব প্রকাশ করে লিখেছিলেন–

“আমি চির বিদ্রোহী বীর!

বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি—একা, চির উন্নত শির!”

যদিও আমি বিশ্ব ছাড়িয়ে উঠিনি, কিন্তু একলা জীবন– তাই, রাতে ঐ টিকটিকিটাকে চিঠি লিখে ডিমগুলোর নিচে কাগজটা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কেননা, বেদনা কাউকে বলতে না পারলে সেটা মনে মনে এমন ফুলে ওঠে যে শেষে নিজেকেই কুঁড়ে কুঁড়ে খায়!

 সকালে উঠে দেখি কাগজটা নেই বটে, কিন্তু ডিমগুলোও আগের। অর্থাৎ কুমিরের বাচ্চা টিকটিকিটা উত্তর দেয়নি। মাথা পুরো হট হয়ে গেল। এখন বসে বসে ফেসবুক ঘাঁটছি। হঠাৎ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটা পোস্ট সামনে এলো। আর মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। 

তাড়াতাড়ি লিখতে শুরু করলাম…

আমাদের রেজাল্টের তারিখও যে জলবায়ুর মতো পরিবর্তনশীল হতে শুরু করেছে, সে বিষয় নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেললাম। 

লেখা শেষ করে সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলাম। কুমিরের বাচ্চাটা আমার চিঠির উত্তর না দিলেও সোনার বাংলা পত্রিকার কর্তৃপক্ষ উত্তর দিয়েছে৷ কয়েকদিন পর পত্রিকায় আমার কবিতাটা দেখতে পেলাম। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। কবিতাটার নাম দিয়েছিলাম “রেজাল্টের দিন কবে?”

৬.

রেজাল্ট দেওয়ার পর একমাস কেটে গেল। আলহামদুলিল্লাহ! রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হয়েছে; সমাজে মুখ দেখাতে পারছি! শুধু ঐ কুমিরের বাচ্চা টিকটিকিটা যে কয়টা বিষয়ের সময় ডিস্টার্ব করেছিল, সেগুলোতে একটু খারাপ হয়েছে। 

রাত প্রায় দশটা। বাইরে ঘন কালো আকাশে তারার মেলা। টেবিলে বসে আমি রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসটা পড়ছি। এমন সময় হঠাৎ পায়ের নিচে শীতল স্পর্শ পেলাম। দ্রুত তাকিয়ে দেখি ডিম! টিকটিকিটা আবার ডিম পেড়ে দিয়ে গিয়েছে। সেগুলো সাবধানে তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করি–

“প্রিয়, 

আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। ধরো আমি যদি কুমির হওয়ার পর তোমার বাবার সেই বন্ধুটার কুমিরের আস্তানায় ঢুকতে পারি, তাহলে তুমি তোমার বাবার সাথে সেখানে গিয়ে আমাকে পছন্দ করে নিয়ে আসতে পারবে। তাহলে তো আর কোনো বাধা থাকবে না। কী বলো?

ইতি,

তোমার টিকটিকিরূপী

দুর্ভাগী কুমির”

আমি উত্তরে লিখলাম–

“তুমি যা বলছো তা নিতান্তই অসম্ভব। আমার বাবার বন্ধুটার কুমিরের আস্তানাটা খুবই সতর্কভাবে পাহারায় রাখা। আর আমি কখনোই তোমার পরিচয় প্রকাশ করতে পারবো না। তারা যদি বলে– তুই কীভাবে এই কুমিরের সন্ধান পেলি? তখন কী আমি মিথ্যা কথা বলবো? আবার যদি সত্যিটা বলি, তাহলে তো লোকে আমাকে পচাবে। বলবে– আমি নাকি কোন একটা টিকটিকির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি!”

৭.

পরদিন রাতে আবার টিকটিকিটার ডিম-চিঠি–

“তুমি আসলে কি? তুমিই তো বলেছো আমার প্রতি তোমার টান আছে। তাহলে নিজের মনের কথা বলতে এতো সংশয় কেন? কাপুরুষ কোথাকার! ঠিক আছে। আমি মেঘনা নদীতেই গিয়ে থাকবো। সেখানে মনের সুখে মাছ ধরে খাবো। তুমি তোমার আসন্ন কুমিরকে নিয়ে সুখে থাকো”

আমি লিখলাম, “এ-ই! আমার দিকটা একটু ভেবে দেখো না! আমার তো হাত-পা বাঁধা। আমি কী করতে পারি? আর তুমি কেন একলা মেঘনা নদীতে পড়ে থাকবা? সুন্দরবনে গিয়ে নিজের আত্মীয়-স্বজনের সাথে থাকলেই তো বেশ হয়।”

পরের ডিম-চিঠি–

“তোমার সিদ্ধান্ত তোমার। আর আমার সিদ্ধান্ত আমার। আমার জীবন নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। দোআ করি, তুমি সুখী হও”

আমি লিখলাম–

“আচ্ছা, তোমার পড়ালেখার কী অবস্থা? খাওয়ার জন্য ঠিকমতো পোকামাকড় পাচ্ছো?”

এরপর আর কোনো ডিম-চিঠি এলো না। আমার মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। 

সে যখন তার ডিম-চিঠি দেয়, আমি ঠিকই উত্তর দিই। কিন্তু যখন আমি চিঠি দিই, তখন সে আর উত্তর দেয় না। এখন যাই! তাড়াতাড়ি ডিমগুলো লুকিয়ে ফেলি। নইলে একবার যদি তা জনসমক্ষে চলে আসে, তবে আমার সম্পর্কে গুজব রটে যাবে যে আমি একটা টিকটিকির সাথে সম্পর্কে যুক্ত। 

নিজেকে ‘নৌকাডুবি’র রমেশের মতো লাগছে। কুমিরের বাচ্চা টিকটিকিটাকে মনে হচ্ছে হেমনলিনী, আর আসন্ন কুমিরটাকে কমলা। পার্থক্য শুধু একটাই—রমেশের সমস্যা ছিল দুজন মানুষ নিয়ে, আর আমার সমস্যা একটা টিকটিকি আর একটা কুমির নিয়ে!

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...