একজন নিঃসঙ্গ মানুষ

জাবের আব্দুল্লাহ

১.

কলটা কেটেই অস্ফুট স্বরে একটা গালি দিলেন এসআই মকবুল হোসেন। বিরক্তিতে তার চোখ জ্বালা করছে। সারাজীবনের অভিজ্ঞতা আর সুনাম যেন খেয়ে গেল এই কেস। আজ তেষট্টি দিন হলো জনাব আলী নিহত হয়েছেন। অথচ মার্ডারটার কোনো সুরাহা করতে পারেননি তিনি। প্রমোশনের দিন-তারিখও ঘনিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে কোনো ভুল করা চলবে না। ছোটখাটো ব্যর্থতাই তার ওসি হওয়ার স্বপ্ন পিছিয়ে দিতে পারে অন্তত পাঁচ বছর। আজ জনাব আলীর দল ধর্মঘট ডেকেছে। এটা বানচাল করে দিতে হবে। এখন মকবুল হোসেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো মিডিয়া ফোকাস কমানো। এই মিডিয়াই যেন দিন শেষে উপর মহলের হুমকি হয়ে ফিরে আসে।

দু’দিন আগে পত্রিকার হেডলাইনে বড় করে ছাপা হলো— ‘জনাব আলীর হত্যা মামলায় পুলিশের ব্যর্থতা’। সেদিনই বড় স্যারের কল এসেছিল। বেশ উত্তপ্ত কণ্ঠ—

: মকবুল সাহেব! দেখেছেন আজকের পত্রিকায় কী লিখেছে?

তিনি গমগম করে উঠলেন।

: না তো স্যার। কিছু হয়েছে কী?

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্দ্বিধায় মিথ্যাটা বলে ফেললেন তিনি।

: ও, আপনারা পুলিশেরা পত্রিকা পড়বেন কেন? সেখানে আপনাদের কাজ কী? আপনাদের তো শুধু প্রমোশন দরকার…।

: এখনই দেখছি স্যার। ওয়ান মিনিট।

: মকবুল সাহেব! আমি এসব আর নিতে পারছি না। আপনি এক্সাক্টলি একটা সময় দিন আমাকে।

: স্যার, প্রব্লেমটা আমি সলভ করে ফেলবো স্যার। আর কিছুদিন মাত্র সময় দিন।

: ওকে। আপনাকে আমি সাত দিন সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে কেস সলভ না হলে …..

ওসি স্যারের কণ্ঠটা ঠিক গর্জনের মতো শোনাল তার কানে।

হঠাৎ এসআই মকবুল হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাকে যেতে হবে নীলক্ষেত এলাকায়—যেখানে জনাব আলীর বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

২.

নিউমার্কেটের কাদের মোল্লার বইয়ের দোকানে বসে আছেন এসআই মকবুল হোসেন। এই বইয়ের দোকানে তার আসা-যাওয়া বহুদিনের—ঢাকা কলেজের সেই স্টুডেন্ট লাইফ থেকে। কাজ ছাড়াও বই কিনতে আসেন মাঝে মাঝেই। চাকরির ব্যস্ততায় জীবন থেকে অনেক কিছু চলে গেলেও বই পড়ার অভ্যাসটা এখনো আছে তার।

সফেদ দাড়ির এই বৃদ্ধকে তার কাছে চাচার মতোই আপন মনে হয়। এককালে শ্রমিকদল করতেন। দুইবার যুগ্ম নির্বাহী সম্পাদকও হয়েছিলেন বোধহয়। বরাবরের মতোই তার মার্কা ছিল দাঁড়িপাল্লা। তার দোকানে আসলেই একটা বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন—

“বুঝলা মিয়াভাই, জীবনে সৎ হইবা। পৃথিবীতে সৎ লোকের বড় অভাব। প্রত্যেকবার আমি দাঁড়িপাল্লা মার্কা কেন লই জানো? কারণ এই মার্কায় সৎ-অসৎ মাপা হয়।”

কত সরল যুক্তি!

হঠাৎ সাদেক মোল্লার ডাকে ঘোর কাটে মকবুল হোসেনের –

: মিয়াভাই! মার্ডারটার ব্যাপারে কদ্দুর কি আগাইলা? যত যাই কও, একলগে দল করছি মেলাদিন। লোকটা বড় ভালো আছিল!

: এখনো কিছুই হয় নাই। কোনো ক্লু পাইতেছি না। মার্ডার করছে, কোনো ক্লু রাখে নাই—এমন তো হয় না।

: কি বলো মিয়াভাই! তুমি না কত বড় বড় কেস সলভ করছো!

মকবুল হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার বারো বছরের জীবনে এমন জটিল কেসের মুখোমুখি তিনি কখনো হননি। দুই মাসেও তদন্তের ফলাফল একদম শূন্য। খুনি কোনো ক্লু -ই রাখেনি? এও কি সম্ভব?

মকবুল সাহেব ঘুরে ঘুরে বই দেখতে লাগলেন। অনেকদিন বই পড়া হয় না। আজ একটা বই নিয়ে যেতে হবে—হালকা ধরনের কোনো প্রেমের উপন্যাস। ভেতরে সবকিছু জট পাকিয়ে আছে। এই জট খোলার জন্য একটু নিশ্চিন্ত সময় কাটানোর দরকার।

বই দেখতে দেখতেই হঠাৎ করে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। চোখের পাতায় অনেকগুলো ভাঁজ পড়ল। বইয়ের এই তাকটায় তিনি যা দেখতে পাচ্ছেন, সেটা কি সত্যি? চোখ তাকে ধোঁকা দিচ্ছে না তো?

কাদের মোল্লাকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলেন তিনি। দ্রুতগতিতে বেরিয়ে গেলেন দোকান থেকে। এই মুহূর্তে কাউকে কিছু জানানো উচিত হবে না।

একটা হালকা প্রেমের উপন্যাস নিতে চেয়েছিলেন—সে কথাও বেমালুম ভুলে গেলেন। তার পরিবর্তে তার হাতে দেখা গেল লাল প্রচ্ছদের একটা পুরোনো বই। কাদের মোল্লা ব্যাপারটা খেয়াল করলেও কিছু বললেন না। এই পাগলা টাইপের এসআই মাঝে মাঝেই কিছু না বলে বই নিয়ে যায়। পরে এসে দাম দেয়। এ তার কাছে নতুন কিছু নয়।

৩.

রুমে এসি চলছে। সঙ্গে ফুল স্পিডে ফ্যানও ঘুরছে। তারপরেও কুলকুল করে ঘামছেন এসআই মকবুল হোসেন। বইটা থেকে কোনো ক্লু তিনি খুঁজে পাননি। শেষ পৃষ্ঠাটা পড়ে বইটা টেবিলের উপর রাখলেন তিনি। ঘড়ি দেখলেন—রাত এগারোটা ঊনত্রিশ। পুরো থানা নিশ্চুপ। তিনি বাইরে এলেন। বাসার বাইরে তিনি কখনও রাত কাটান না।

এই বইয়ের লেখকের নাম জনাব আলী। সেই জনাব আলী, যার রহস্যজনক মৃত্যুর কোনো কুলকিনারা এখনো পাওয়া যায়নি। আত্মজীবনীমূলক এই বইটি তিনি লিখেছিলেন ২০০৯-এর শেষের দিকে। প্রকাশ পাওয়ার পর দারুণ হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল বইটি। কারণ এই বইয়ে তিনি এমন গোপন কিছু তথ্য তুলে এনেছিলেন, সরকারের পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠেছিল। সে বছরের ডিসেম্বরেই বইটি নিষিদ্ধ করে সরকার। দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে সব কপি পুড়িয়ে ফেলা হয়। মকবুল সাহেবের মনে পড়ে, এই বইটি লুকিয়ে রেখেছিল বলে এক যুবককে থানায় এনে কী মারটাই না তিনি মেরেছিলেন!

আরেকটা কারণেও বইটা উত্তেজনার জন্ম দিয়েছিল। বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় জনাব আলী লিখেছিলেন, কিভাবে তার মৃত্যু হবে তিনি অনুমান করতে পারছেন—এবং সেটা তিনি বইয়ের মধ্যেই সাংকেতিকভাবে উল্লেখ করেছেন। তখন বিষয়টা নিয়ে কেউ খুব একটা মাথা ঘামানোর সময় পায়নি, কারণ প্রকাশের নয় দিন পরেই বইটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

কাদের মোল্লার দোকানে শেলফের এক কোণে বইটা দেখে মুহূর্তেই এসব কথা মনে পড়ে গিয়েছিল এসআই মকবুল হোসেনের। চমকে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েও সেই সাংকেতিক তথ্য তিনি উদ্ধার করতে পারেননি।

বাসায় খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার বইটা নিয়ে বসলেন তিনি। সহজ সরল ভাষায় লেখা সুখপাঠ্য বই। মাঝে মাঝে কিছু অতি ভয়ানক তথ্য। কিন্তু মৃত্যু সম্পর্কে কোথাও কিছু লেখা নেই। তাহলে কি কিছুই নেই এই বইয়ে? এখান থেকেও কোনো ক্লু পাওয়া যাবে না?

বই রেখে যখন তিনি ঘুমোবার জন্য লাইট অফ করছেন, তক্ষুনি একটা ভাবনা তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। ধড়মড় করে উঠে বসে তিনি লাইট জ্বালালেন। পাশের টেবিল থেকে নোটবুকটা টেনে নিয়ে কিছু একটা লিখতে শুরু করলেন।

৪.

ফরেনসিক রিপোর্টটা আরেকবার খুললেন মকবুল সাহেব। প্রত্যেকটা শব্দ গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। নতুন কিছু চোখে পড়লো না। এই কয়দিনে কতবার যে পড়েছেন এই রিপোর্ট! রিপোর্টটা রাখতে যাবেন, ঠিক তখনই একটা মেইল এলো তার ফোনে। মেইল এসেছে ফরেনসিক ল্যাব থেকে।

মেইলটা পড়ে তার ভ্রু কুঁচকে গেলো। লাশের হাতে অদ্ভুত কিছু সংখ্যা দেখতে পাওয়া গেছে। এক ধরনের বিশেষ ক্যামিকেল দিয়ে লেখা হয়েছিলো বলে খালি চোখে দেখা যাচ্ছিল না সংখ্যাগুলো। বিশেষ এক ধরনের আলো ফেলার পর সব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেইলে সংখ্যাগুলোর বিবরণ এ রকম দেওয়া—

৫ : ১৩

৩১ : ৩৩

৬৭ : ৫৪

৭৮ : ৬৭

১০১ : ০৯

সংখ্যাগুলো দেখে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন তিনি। কি হতে পারে? এলোমেলো এই সংখ্যাগুলো কি নির্দেশ করছে? কোনো বিশেষ কোড? এর সমাধান কোথায় খুঁজবেন তিনি? কেসটা যে ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছেন তিনি।

হঠাৎ কি মনে করে যেন বইটা হাতে নিলেন তিনি। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠলো একটা চিন্তা—এমন হতে পারে না যে প্রথম সংখ্যাটা পৃষ্ঠাসংখ্যা আর দ্বিতীয় সংখ্যাটা শব্দসংখ্যা নির্দেশ করছে?

তড়িঘড়ি করে নোটবুকটা খুললেন। বই থেকে ঘেঁটে ঘেঁটে পৃষ্ঠা ও শব্দগুলো বের করলেন। একটার পাশে একটাকে রেখে সাজালেন। তারপর ভাবতে শুরু করলেন। বিস্তর ভাবনা চিন্তার পর যখন তিনি একটা সমাধানে পৌঁছলেন,

ততক্ষণে বাইরে ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। রাত কেটে গেছে। মকবুল সাহেব নামাজটা পড়ে বিছানায় মাথা রাখলেন। এখন হয়তো খানিকটা সময় আরামে ঘুমাতে পারবেন।

আজ সারাদিন অনেক কিছু ঘটবে। সে জন্য একটু মানসিক শান্তি দরকার।

৫.

[সাংকেতিক সংখ্যা থেকে চিঠি:

পাঁচটা সংখ্যার নির্দেশনা অনুযায়ী বই থেকে এই পাঁচটা শব্দ উদ্ধার হয়।

চিলেকোঠা – আজিমপুর – চৌষট্টি – চিঠি – ঝিন্দের বন্দী

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজিমপুরে জনাব আলীর একটা দোতলা বাড়ি আছে, যেটার কথা কেউ জানত না। সেখানে পৌঁছে চিলেকোঠার ঘরে বুকশেলফে ঝিন্দের বন্দী বইটা সত্যি পাওয়া যায়। আর সেই বইয়ের চৌষট্টি নং পৃষ্ঠায় পাওয়া যায় মলিন একটা চিঠি।]

বইয়ের ভেতর থেকে মলিন হয়ে আসা চিঠিটা বের করার পর স্বস্তির হাসি ফুটলো এসআই মকবুল হোসেনের মুখে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে তিনি চিঠিটা খুললেন—

“অর্থ আর সম্মান থাকলেই যে মানুষের জীবনে শান্তি আসে, এই তত্ত্বটি ভুল মনে হয় আমার কাছে। আমার অর্থের অভাব নেই, আল্লাহ সম্মানও দিয়েছেন, তবু কি শান্তি আছে আমার জীবনে? এই প্রশ্নটির খুব নির্দয় অথচ বাস্তব উত্তর হলো—না। ভীষণ নিঃসঙ্গ একজন মানুষ আমি। সারা রাত আমি একা একা নিজের সঙ্গে কথা বলি। একটা মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হলে নিজের সঙ্গে কথা বলে ভাবতে পারেন?

এই নিঃসঙ্গতা অবশ্যই আমার নিজের নয়। আমাকে একজন দান করে গেছে। তাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, আর সে বিনিময়ে আমাকে দান করেছে এক ভয়াবহ নিঃসঙ্গ জীবন।

এই জীবন আমি আর বইতে পারছি না। আমাকে হয়ত আত্মহত্যাই করতে হবে। আজ না হোক, দুই চার বছর পরে। কতদিন এই যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন বয়ে বেড়াবো?

যদি সত্যি সত্যিই আত্মহত্যা করতে হয়, তাহলে একটা অদ্ভুত উপায়ে আমি আত্মহত্যা করবো। গল্পটা এমনভাবে সাজাবো, যেনো মনে হয় আমাকে খুন করা হয়েছে। জীবদ্দশায় কেউ আমার কথা ভাবেনি, মৃত্যুর পর অন্তত ভাবুক।

একজন নিঃসঙ্গ মানুষ

১৩-১১-২০০৯

চিঠি শেষ করে হাসি ফুটলো এসআইয়ের মুখে। অবশেষে একটা সমাধান হলো। প্রমোশনটা বোধহয় এবার হয়ে যাবে। তিনি একটা প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করলেন। জনাব আলীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেখানে লেখা হলো—অদ্ভুত উপায়ে আত্মহত্যা।

রিপোর্টটা তৈরি হওয়ার পর হঠাৎ করেই তার মনে পড়লো – একটা ব্যাপার এখনো ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে। কোনো খোঁজ খবর নেয়া হয়নি এই ব্যাপারে। জনাব আলীর সেই বই কাদের মোল্লার দোকানে এলো কি করে? তিনি তো দুদিন পরপরই যান সেখানে, আগে তো চোখে পড়েনি কখনও। একটা নিষিদ্ধ বই কি করে পৌঁছালো নিউমার্কেটের এই বইয়ের দোকানে? তার মানে হলো—গত দুই-তিন দিনের ভেতরেই বইটা এসেছে কাদের মোল্লার দোকানে। কিন্তু কিভাবে?

ভাবনাটা শেষ হওয়ার আগেই টেবিলে থাকা টেলিফোনটা বেজে উঠলো। জনাব আলীর আজিমপুরের বাড়ি থেকে একজন হাবিলদার ফোন করেছে। বাড়ির সেই বুকশেলফ থেকে অনেকগুলো ছবি পাওয়া গেছে। একজন মহিলার ছবি।

৬.

বইটা দেখে কাদের মোল্লার চোখ কপালে উঠে গেলো।

: এই বই তুমি কোথায় পাইলা, মিয়াভাই?

এসআই মকবুল হোসেন কোনো উত্তর দিলেন না। গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন কাদের মোল্লার দিকে। কিন্তু তার চামড়া ভাঁজ পড়া চেহারায় নির্দোষ কৌতূহল ছাড়া আর কিছু খুঁজে পেলেন না। নিস্পৃহ গলায় তিনি উত্তর দিলেন—আপনার দোকানে, চাচা।

: আমার দোকানে? ভীষণ চমকালেন কাদের মোল্লা।

: হ্যাঁ, আপনার দোকানে। কিন্তু এই বই আপনি কোথায় পেলেন?

: আমি তো মিয়াভাই, জানিনা কিছু এই বইয়ের ব্যাপারে। এটা তো আমার দোকানে থাকার কথা না। নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই বই কোনোদিন দেখিও নাই আমি।

মকবুল সাহেব কঠিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। তিনি পকেট থেকে একটা ছবি বের করলেন।

: এই মহিলাকে চেনেন আপনি? দেখেছেন কোথাও?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ছবিটির দিকে। তারপর উত্তেজিত গলায় বললেন—’এই মহিলাকে তো আমি চিনি মিয়াভাই। দুইদিন আগে বই কিনতে আসছিল। ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ বই দেখলো। তারপর দুইটা বই কিনে চইলা গেলো। কেনো, মিয়াভাই, কি হইছে?’

মকবুল সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। এখন এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় নেই। যত দ্রুত সম্ভব সেই মহিলাকে খুঁজে বের করতে হবে।

৭.

মহিলার খোঁজ পাওয়া গেলো তিনদিন পর। মগবাজারের এক দোতলা বাড়িতে থাকেন তিনি। তবে দুঃখের বিষয় হলো—মহিলার কাছ থেকে কোনো তথ্য জানা গেলো না। কারণ মকবুল সাহেবের পৌঁছার একদিন আগে সেই মহিলাও আত্মহত্যা করে ফেলেছিলেন। কোনো তথ্য জানতে না পারলেও তিনি একটি সুইসাইড নোট পেলেন। সেই নোট পড়তে গিয়ে রীতিমতো কেঁপে উঠতে লাগলো তার শরীর।

৮.

প্রিয়তম,

প্রায়ই তুমি চিঠিতে লেখো আত্মহত্যা করবে—এই নিঃসঙ্গতা আর নিতে পারছো না তুমি। কিন্তু আমি জানি, তুমি কোনোদিনই আত্মহত্যা করতে পারবে না। এই সাহস তোমার নেই। মাঝে মাঝে তোমার এই নিঃসঙ্গতার গল্পটাও আমার কাছে মিথ্যে মনে হয়। মিথ্যে হলেও কিন্তু আমার সত্যি ভাবতে ইচ্ছে করে। তুমি আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছো, এখনো আমাকে তেমনি ভালোবাসো—এ কথা ভাবলে এখনো খুব ভালো লাগে। অদ্ভুত ব্যাপার না?

তুমি সবসময় জানতে চাও, কেন তোমায় ছেড়ে এসেছি। কী অপরাধ ছিল তোমার। কোনোদিন বলিনি। সব কথা কি আর হুটহাট বলে ফেলা যায়? কিছু কথা বলার জন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়। আমার মনে হয়, আজ সেই সময় এসেছে।

দুই হাজার তিনের সেই দাঙ্গার কথা মনে আছে তোমার? তোমাদের শ্রমিক দলের সেই বিখ্যাত দাঙ্গা! সেখানে একটা ছেলেকে তুমি নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিলে। হাসতে হাসতে আমাকে সেই গল্পও শুনিয়েছিলে একদিন।

আচ্ছা, তুমি কোনোদিন জানতে চেষ্টা করেছো—সেই ছেলেটার পরিচয় কী? করোনি নিশ্চয়ই। না করাই ভালো হয়েছে। খোঁজ করলে ভয়ংকর একটা খবর জানতে পারতে। জানতে—যাকে তুমি গুলিতে ঝাঁঝরা করে মেরেছো, সেই ছেলেটা ছিল আমার খুব আদরের ছোট ভাই। আমার জীবনে বোধহয় আমি খুব বড় কোনো পাপ করেছি। নাহলে কেউ নিজের ভাইয়ের খুনিকে ভালোবাসে?

তোমাকে দেখলে একই সঙ্গে দুই রকমের অনুভূতি হতো। ছোট ভাইটার মুখ মনে পড়তো খুব। ইচ্ছে হতো, নিজ হাতে তোমাকে খুন করে ফেলি। আবার খুব ভালোও বাসতাম তোমাকে। তোমার শুকনো মুখ দেখলে ভীষণ কষ্ট হতো। তোমার কষ্ট তো শুধু আমাকে হারানোর; কিন্তু আমার কষ্ট?

আজকেই হয়তো তোমার জীবনের শেষ দিন। অনেক ভেবে আমি ঠিক করেছি—ছোট ভাইটার হয়ে আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি হয়তো খুব কষ্ট পাবো, কিন্তু আমার ভাইটার আত্মা তো শান্তি পাবে। কী কারণে জানি না, তুমি লিখতে—তুমি এমনভাবে আত্মহত্যা করবে, লোকে যেন সেটাকে খুন মনে করে। সেই ব্যবস্থাই আমি করলাম। আর তোমার বইয়ের সেই একটা কপি, যেটা এতদিন আগলে রেখেছিলাম, সেটা তোমার বন্ধুর দোকানে রেখে আসবো আমি। বইয়ের সেই গোপন সংকেত বের করে কেউ হয়তো তোমার সেই চিলেকোঠার চিঠিটা খুঁজে পাবে। এসব করার আসলে কোনো দরকার ছিল না—কেবল এজন্যই করলাম যে, তুমি চাইতে মৃত্যুর পরে তোমাকে নিয়ে আলোচনা হোক। তুমি দেখো, পুরো দেশে আলোচনা হবে তোমাকে নিয়ে।

তুমি মারা যাওয়ার ঠিক আড়াই মাস পর আমি আত্মহত্যা করবো। অবাক লাগছে? অবাক লাগলেও সত্যি আমি কাজটা করবো। সেই যে বললাম—তোমাকে ঘৃণা করতে পারিনি, এখনো ভালোই বাসি। এখন তো প্রতি রাতেই আমার এ কথা মনে পড়বে—তোমাকে আমি খুন করিয়েছি। তখন কী ভীষণ যন্ত্রণা হবে আমার, বুঝতে পারছো? সেই যন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্তি দেবো আমি। তুমি হাজারবার চেয়েও আত্মহত্যা করতে পারোনি—তোমার হয়ে আমি আত্মহত্যা করবো।

ভালো থেকো। খুব অচিরেই আমাদের দেখা হবে। তখন আর কোনো মান–অভিমান,অভিযোগ থাকবে না।

— ইতি

২৭-০৮-২০১৫

পরিশিষ্ট:

মকবুল সাহেবের প্রমোশন হয়ে গেছে। তিনি ওসি হয়েছেন। কাদের মোল্লা মারা গেছেন ডিসেম্বরের শেষ দিকে। বইয়ের দোকানটা ভেঙে একটা ছাপাখানা বানানো হচ্ছে। ইদানীং আর ওদিকে তার যাওয়া হয়ে ওঠে না বড় একটা।

বইও আর পড়া হয় না তেমন। শুধু মাঝে মাঝে ওসি মকবুল হোসেন জনাব আলীর সেই বইটা নিয়ে বসেন। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকেন। এবং পড়তে পড়তেই তার মনে হয়—এই বইয়ের অনেক রহস্য এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...