মুজাহিদ শিহাব
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল।
বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডে তখন মানুষের ভিড় একটু একটু করে কমে আসছে। সারাদিনের বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু ছাউনির টিন থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছিল। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে বাসের হেডলাইটের আলো পড়ে কেমন হলদেটে দেখাচ্ছিল।
আমি একটা বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
তখনই ছেলেটাকে দেখলাম।
বয়স বারো কি তেরো হবে। স্কুলের সাদা শার্টটা ময়লা হয়ে ধূসর দেখাচ্ছে। প্যান্টটা হাঁটুর কাছে ছেঁড়া। পায়ে একটা জুতা, অন্য পায়ে শুধু মোজা। কাঁধে একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ।
ছেলেটা বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল।
একবার ডানে।
একবার বাঁয়ে।
তারপর আবার একই জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছিল।
প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো কারও জন্য অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
—কাউরে খুঁজতেছ?
ছেলেটা আমার দিকে তাকাল। একটু চুপ করে থেকে বলল,
—আম্মুর জন্য।
—কখন থেকে আসছ?
—দুপুরের পর।
—এতক্ষণ?
সে মাথা নাড়ল।
—হুম।
—আম্মু কোথায় গেছে?
—কাজে গেছিল।
—কোথায় কাজ করে?
—বাসাবাড়িতে।
কথাটা বলেই সে আবার রাস্তার দিকে তাকাল।
আমি বললাম,
—ফোন আছে?
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,
—আম্মুর আছে। আমার নাই।
—তাহলে যোগাযোগ করো কীভাবে?
—আম্মু আসবে বলছে।
তারপর একটু থেমে বলল,
—আসার কথা।
শেষ কথাটা খুব আস্তে বলেছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—তোমার নাম কী?
—রায়ান।
—বাড়ি কোথায়?
সে একটু ইতস্তত করে বলল,
—ওই… নতুন বাজারের দিকে।
—কাদের সঙ্গে থাকো?
—আমি আর আম্মু।
—আব্বু?
রায়ান এবার উত্তর দিল না।
শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে জুতার ফিতেটা টানতে লাগল।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
কিছুক্ষণ পর বললাম,
—খিদা লাগছে?
সে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—কী খাবে?
—কিছু না।
—কিছু না মানে?
—আম্মু আইলে খাব।
আমি হেসে বললাম,
—আম্মু আসতে দেরি করলে?
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে দেরি করেই খাব।
কথাটা এমনভাবে বলল, যেন এটাই স্বাভাবিক।
আমি দোকান থেকে একটা বান আর পানি কিনে এনে ওর হাতে দিলাম।
সে সঙ্গে সঙ্গে নিল না।
—নাও।
—আম্মু আসলে খাব।
—এখন খাও। আম্মু এলে আবার খাইয়ো।
সে বানটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—টাকা কত?
—টাকা লাগবে না।
—কেন?
—এমনি।
—না, এমনি খাই না।
আমি একটু হেসে বললাম,
—আজকে আমার মন চাইছে কাউকে কিছু খাওয়াতে।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বানটা নিল।
খেতে শুরু করল খুব ধীরে।
এক কামড়।
তারপর রাস্তার দিকে তাকানো।
আবার এক কামড়।
আমি বললাম,
—তুমি কি স্কুলে পড়ো?
—হুম।
—কোন ক্লাস?
—সেভেনে।
—স্কুলে যাও নিয়মিত?
সে এবার একটু হেসে বলল,
—যাই তো।
—সব দিন?
—সব দিন পারি না।
—কেন?
—কাজ থাকলে যেতে পারি না।
—কী কাজ?
সে কাঁধ ঝাঁকাল।
—যা পাই করি।
আমি আর কিছু বললাম না।
কিছুক্ষণ পর সে নিজে থেকেই বলল,
—আম্মু বলে, পড়াশোনা বাদ দেওয়া যাবে না।
—তোমার পড়তে ভালো লাগে?
রায়ান একটু ভেবে বলল,
—ভালো লাগে।
—কী হতে চাও?
সে হেসে ফেলল।
—জানি না।
—কিছু একটা তো ভাবছ।
—বাস চালাব।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—বাস?
—হুম। বড় বাস।
—ড্রাইভার হবে?
—হুম।
—কেন?
সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে আম্মুকে আর বাসে উঠতে হবে না।
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
কিছুক্ষণ পর রায়ান বলল,
—ভাইয়া…
—হুম?
—আম্মু আসবে তো?
আমি বললাম,
—আসবে।
সে আবার জিজ্ঞেস করল,
—আপনি জানেন?
আমি একটু থেমে বললাম,
—না। তবে আসবে।
রায়ান মাথা নিচু করে রইল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—আজকে বাসাও ছাড়তে হবে।
—কেন?
—বাড়িওয়ালা কইছে, দুই মাসের ভাড়া বাকি। আজকে না দিলে থাকতে দেবে না।
—তোমাদের যাওয়ার জায়গা আছে?
—আম্মু বলছে একটা জায়গা দেখছে।
—কোথায়?
—জানি না।
—তোমার আম্মু একাই সব সামলায়?
সে মাথা নাড়ল।
—হুম।
—কষ্ট হয়?
রায়ান এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আম্মুর হয়।
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
—আমার না।
আমি কিছু বললাম না।
কারণ বুঝতে পারছিলাম, ও মিথ্যা বলছে।
সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে এল।
বাসস্ট্যান্ড প্রায় ফাঁকা।
আমি ভাবছিলাম, ছেলেটাকে থানায় নিয়ে যাব কি না। কিন্তু ওকে একা রেখে যেতেও পারছিলাম না।
শেষে বললাম,
—চলো, থানায় যাই। তোমার আম্মুকে খুঁজতে সাহায্য করবে।
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—না।
—কেন?
—আম্মু আসলে আমাকে না পেলে ভয় পাবে।
—তাহলে পুলিশকে বলব তুমি এখানে অপেক্ষা করছ।
—না।
—কেন না?
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আম্মু পুলিশ দেখলে ভয় পায়।
আমি আর জোর করলাম না।
কিছুক্ষণ পর সে নিজেই বলল,
—আপনি থাকবেন?
—হুম।
—আম্মু না আসা পর্যন্ত?
আমি বললাম,
—যতক্ষণ পারি।
সে তখন প্রথমবারের মতো একটু নিশ্চিন্ত হলো।
রাত প্রায় আটটার দিকে একজন মহিলা দৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে ঢুকলেন।
শাড়িটা ভিজে গেছে। হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। হাঁপাচ্ছিলেন।
দূর থেকেই চিৎকার করে বললেন,
—রায়ান!
ছেলেটা উঠে দাঁড়াল।
—আম্মু!
মহিলাটা এসে ওকে জড়িয়ে ধরলেন।
—কোথায় ছিলি রে? কত জায়গায় খুঁজছি!
রায়ান মায়ের গলা জড়িয়ে বলল,
—আমি তো এইখানেই ছিলাম।
—এইখানে একা বসে ছিলি?
—হুম।
মহিলাটা আমার দিকে তাকালেন।
—আপনি ওর সঙ্গে ছিলেন?
আমি বললাম,
—হ্যাঁ। দুপুর থেকে এখানে ছিল। তাই…
তিনি হাতজোড় করে বললেন,
—ভাই, অনেক উপকার করছেন।
—না, কিছু না।
তিনি রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—কিছু খাইছিস?
রায়ান বলল,
—হুম।
—কী খাইছিস?
সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—বান।
মহিলাটা বুঝতে পারলেন।
—আপনি খাওয়াইছেন?
আমি বললাম,
—হ্যাঁ, সামান্য।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—আল্লাহ ভালো রাখুক আপনাকে।
আমি বললাম,
—আপনারা এখন কোথায় যাবেন?
তিনি একটু থেমে বললেন,
—জানি না।
—মানে?
—বাড়িওয়ালা ঘর ছাড়তে কইছে।
—কোথাও ঠিক করেছেন?
—একটা জায়গা দেখছি। কালকে কথা কইব।
আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করতে চাইলাম।
তিনি হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
—না ভাই।
—রাখেন। কাজে লাগবে।
—না।
—আপনার দরকার হবে।
তিনি এবার একটু হেসে বললেন,
—দরকার তো অনেক কিছুই আছে।
তারপর টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—কিন্তু সব দরকারের জন্য মানুষের কাছে হাত পাতলে… একসময় নিজের হাতটাকেই নিজের মনে হয় না।
আমি হাতটা নামিয়ে ফেললাম।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি রায়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ওর পড়াশোনাটা যেন বন্ধ না হয়, ভাই।
আমি বললাম,
—চেষ্টা করবেন।
তিনি হেসে বললেন,
—চেষ্টা তো করি। সবসময় পারি না।
তারপর রায়ানের হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন।
কয়েক পা যাওয়ার পর রায়ান পেছনে তাকাল।
—ভাইয়া!
আমি বললাম,
—হুম?
—কাল স্কুল আছে।
—যাবে?
সে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
—যেতে হবে।
আমি হাসলাম।
—যেও।
রায়ানও হাসল।
তারপর মা-ছেলে অন্ধকারের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেল।
এরপর অনেকদিন রায়ানের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
কয়েক মাস পর একদিন ডাকযোগে একটা চিঠি পেলাম।
খামের ওপর আমার নামটা কেমন কাঁচা হাতে লেখা।
চিঠিটা খুলে দেখি—
“ভাইয়া,
আমি রায়ান।
আমরা এখন অন্য জায়গায় থাকি। আম্মু কাজ করে। আমি স্কুলে যাই।
সেদিন আপনি যে বানটা দিছিলেন, আম্মু বলছিল, মানুষের কাছে কিছু নিলে লজ্জা করতে নাই। কিন্তু আমি বুঝি না, তাহলে আম্মু টাকা নিল না কেন।
আপনি সেদিন বলছিলেন, মানুষকে সাহায্য করতে বড় কিছু লাগে না।
আমি এখন মাঝে মাঝে আমার বন্ধুদের খাতা দিই।
আর একটা কথা।
আম্মু সেদিন বলছিল, মানুষ হওয়া আর মানুষ হয়ে বাঁচা এক জিনিস না।
আমি কথাটা বুঝি না।
আপনি বুঝলে আমাকে বলবেন।
—রায়ান”
চিঠিটা অনেকক্ষণ হাতে নিয়ে বসে ছিলাম।
কী উত্তর দেব, বুঝতে পারিনি।
কারণ সত্যি বলতে, আমিও কথাটার পুরো মানে জানতাম না।
দুই বছর পর এক সন্ধ্যায় আবার সেই বাসস্ট্যান্ড দিয়ে যাচ্ছিলাম।
বৃষ্টি হচ্ছিল।
ছাউনির নিচে একটা ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে।
স্কুলের পোশাক পরা।
কাঁধে ব্যাগ।
বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।
আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বললাম,
—কার জন্য অপেক্ষা করছ?
ছেলেটা বলল,
—আম্মুর জন্য।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—অনেকক্ষণ?
—হুম।
তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি যাবেন না?
আমি মাথা নাড়লাম।
—না। একটু থাকি।
ছেলেটা কিছু বলল না।
আমিও বললাম না।
শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কারণ সেদিন রায়ানের পাশে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিস শিখেছিলাম—
সব অপেক্ষার শেষ আমরা জানি না।
কখনো কখনো কারও জন্য কিছু করার মানে তাকে কোথাও পৌঁছে দেওয়া নয়।
শুধু সে যতক্ষণ অপেক্ষা করে,
ততক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।








