পারুল

একদিন বিকেল বেলা পারুল রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছিল।তাদের বড় ঘরের পেছন দিয়ে রাস্তা চলে গেছে।কাঁচা রাস্তা।পাশে একটা রুয়াইল গাছ ছিলো।গাছে রুয়াইল এসেছে।ঘন সবুজ পাতা নিয়ে রুয়াইল গাছটা ছাতার মতো তার ডালপালা মেলে ধরেছে।থোকা,থোকা সবুজ রুয়াইল ঝুলছিলো ডালে,ডালে।রাস্তার পাশে বড় বড় কড়ই গাছ নিবিড় ভাবে ছায়া বিস্তার করেছিল সমস্ত রাস্তা জুড়ে।ডানপাশে রাস্তার সাথে মেহগনি গাছের বাগান।কাঠ গাছ।
পারুল দুধের মতো ধবধবে সুন্দর আর সহজ সরল প্রকৃতির মেয়ে।কৈশোর পেরিয়ে কেবল যৌবনে পদার্পণ করেছে।এখনও শরীরের যত্ন নেয়া শেখেনি।কিন্তু সৌন্দর্য তার সেই শারীরিক যত্নের উদাসীনতাকে ম্লান করে ফেলেছে।পারুল বুকের ওপর উড়না পেঁচিয়ে রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছিল আর ঠিক তখনই দুটি পুরুষ লোক তাদের বাড়িতে গিয়ে ঢুকলো।তাদের একজন পারুলের দুলাভাই।ফুপাতো বোনের জামাই।অন্যজন কে সে চেনে না।লোকটি পারুলকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।এবং তার সেই চাহনির মধ্যে একটা তীব্র আকাঙ্খা ছিলো।লোকটাকে দেখে পারুলের ভালো মনে হয় নাই।তার চাহনি দেখে পারুল নিজেকে পরিপাটি করে নিলো।

লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।ফুলপ্যান্ট আর শার্ট পরে এসেছে।চোখে কালো চশমা।মাথার চুলগুলো সিল্কি।দেখেই বোঝা যায় চুলে প্রতিদিন শ্যাম্পু করে।তুলনামুলক চুল লম্বা।গায়ের রং শ্যামলা।লোকটি পারুলের বোন জামাইয়ের বন্ধু।বাড়ি এক গ্রামেই।বোন জামাইয়ের সাথে বেড়াতে এসেছে।
বাড়ির ভেতর এসে দুয়ারে বসে পারুলের মায়ের সাথে অনেক কথাবার্তা বলতে লাগলো।লোকটি অনেক কথা বলতে পারে।পারুলের মা আবার ঘন কথা বলার লোক।যার তার সাথে গল্পে মজে যায়।এখানেও তাই হল।পারুলের মা জামাতা আর জামাতার বন্ধুকে ঘরে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করতে বললো।
পারুল আর বাড়ির ভেতরে ঢুকলো না।ঝাড়ু দেওয়া শেষ হলেও সে আড়ালে দাঁড়িয়ে মেহমানদের দেখতে লাগলো।তার ভেতরে একই সাথে ভয় এবং লজ্জা কাজ করতে লাগলো।

যাওয়ার সময় লোকটি আবার পারুলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।দৃষ্টি যেন স্থির হয়ে গেল তার।চোখ যেন সরতেই চায় না।
পারুল ঝাড়ু হাতে নিয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে এলো।লজ্জায় সে তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলো না।

পারুল তিন বছর ধরে সেয়ানা হয়ে উঠেছে।বয়স এখন চৌদ্দ।তার সমস্ত শরীরে যেন শবরী কলার রঙ মেখে দিয়েছে কেউ।মুখটা এতো উজ্জ্বল আর মায়াবী যে শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে।ওই মুখে যেন সৃষ্টিকর্তা সমস্ত মাধুর্য ঢেলে দিয়েছেন।বাবা গরীব।বাড়ির অবস্থাও গরীবানা হালের।নয় ফুটি টিনের একটা দুই চালার ঘর আছে বাড়িতে।সময়মতো সবটা(প্রসাধণী সামগ্রী)পারুল পায় না।মাটি কেটে,কখনও পরের জমিতে কামলা দিয়ে পারুলের বাবা সংসার চালায়।এমন গরীব ঘরে পারুলের মতো এতো সুন্দরী একটা মেয়ে হওয়ার কথা না।তার বাবা মা কেউ এমন সুন্দুরও না।তার আরো ভাইবোন আছে।সবার ভেতর সেই হয়েছে আলাদা;সুন্দুর।এ যেন গোবরে পদ্মফুল।আর যৌবনে পা দিয়েই সেই সৌন্দর্য বেড়ে গেছে তিনগুণ।লাউ ডগার মতো লকলক করে বেড়ে উঠেছে।

দুইদিন পর পারুলের বিয়ের প্রস্তাব এলো।সেই লোকটির বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।পারুলকে লোকটির জন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে বউ করে নিতে চায়।লোকটির বাড়ি পদ্মার ওপারে হাজীগঞ্জ উপজেলায়।সেখানে আবার পারুলের এক ফুপুর বাড়ি আছে।ফুপুর মাধ্যমে ছেলের বাড়ির খোঁজ খবর নিলো।বাজারের পাশে ছেলেদের পুরনো বাড়ি।জায়গা কম হলেও অনেক টাকার সম্পত্তি।পরিবারে সন্তান লোকটি একাই।পারুলকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে লোকটির।লোকটির পরিবারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করছে পারুলকে বিয়ে দেওয়ার জন্য।জোড়ালো আবদার করছে সবাই।পারুলকে তারা বউ করে নিবেই।পারুলের বাবা প্রথমে রাজি না হলেও পারুলের মায়ের কথায় রাজি হল।একদিন তার এক ভাইকে সাথে নিয়ে ছেলের বাড়ি দেখে এলো।সবকিছু ঠিক আছে।ছেলের অর্থ সম্পত্তি আছে।ছেলে একাই।তারপর উভয় পক্ষ বসে কথাবার্তা বলে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে ফেললো।মাথায় মটক,পরনে শেরওয়ানি আর পায়ে নাগড়া পরে বর সেজে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে বিয়ে করতে এলো লোকটি।স্পষ্ট উচ্চারণে কাজী তিনবার করে কবুল পড়ালেন।বিয়েতে পারুলের বাবা তেমন আয়োজন করতে পারেনি।কিছু নিকটাত্মীয় আর দুই এক ঘর পাড়াপ্রতিবেশি নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছে।কিন্তু টাকা উঠাবে বলে কাউকে দাওয়াত করেনি।সাধারণ সাজগোজ করে একটা লাল শাড়ি পরে পারুল দুই চালার ঘরে কনে সেজে বসে আছে।তার মুখটা বিষণ্ণ এবং নিরানন্দ।মন থেকে হয়তো সে বিয়েতে রাজি হয়নি।শুভ দৃষ্টির সময় পারুল লজ্জায় চোখ মেলে তাকাতেই পারলো না।জামাই অত্যন্ত চালু।বিয়ের দিনই সেটা দেখা গেল।পারুল তার দিকে চোখ মেলে তাকায় না দেখে সবাই যখন চোখ মেলে তাকানোর জন্য জোর করতে লাগলো তখন সে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললো,না তাকাইলো।আপনেরা জোর করেন ক্যাঁ?না তাকাইলে বিয়া অইবো না।কতো তাকাইবো।পারুলের দূর সম্পর্কের দুই দুলাভাই দুই পাশে দাঁড়িয়ে মাঝখান দিয়ে একটা বিছনা চাদর টেনে ধরে রেখেছিল।এই কথা বলার পর তারা চাদর ছেড়ে দিলো।ভালোভাবেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
কিশোরী মেয়ে পারুল এখন নতুন বউ।স্বামীর হাত ধরে নৌকায় গিয়ে উঠলো সে।

বিয়ের পর ছয় মাস কেটে গেল।আস্তে আস্তে জামাইয়ের আসল চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠলো।জামাই ভালো না।নেশাখোর।খারাপ ছেলেদের সাথে চলাফেরা করে।মুখের ভাষা যা-তা খারাপ।পারুলকেতো বকাবাজি করেই নিজের বাপ- মাকেও ছাড় দেয় না।পারুল খুবই অশান্তিতে আছে।পারুলের মা বাবা পারুলকে চলে আসতে বলে।বলে তাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিবে।কিন্তু পারুল আসে না।সে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে থাকে।এই ছয় মাসেই পারুলের শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে।চেহারায় মলিনতা এসেছে।মনের ভেতর অশান্তি।সময়ের খাওয়া সময়ে খায় না।শরীরের কোনো যত্ন নেই।সে এখানে বিয়েতে রাজি ছিলো না।বাবা মাকে পারুল বলে,তোমরা আমারে এমন জাগায় দিছাও ক্যাঁ?এহন কইলেই কী আহুন যায়?

পারুলের বাবা পারুলকে দুইবার করে বাড়িতে নিয়ে এলো।তাদের অভিমত হলো তারা পারুলকে আর দিবে না।কিন্তু মানুষজন নিয়ে এসে প্রতিবারই নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে পারুলকে আবার নিয়ে গেল।তাছাড়া পারুলও এভাবে এখানে থাকতে চাইছিলো না।সে আসলে দেখতে চাইছিলো তার স্বামী ভালো হয় কিনা।সে এই বয়সেই বুঝতে পেরেছিলো যে একটি মেয়ের জন্য স্বামীর বাড়িই হচ্ছে সম্মান এবং গৌরবের।আর একবার বিয়ে হওয়ার পর আবার বিয়ে হওয়াটা মানুষ কখনও ভালো চোখে দেখে না।তারা মুখে যতোই জামাইকে খারাপ বলুক,ভেতরে ভেতরে নিন্দা তারা করবেই।পারুলের পেটে তখন দুই মাসের বাচ্চা।খাওয়া দাওয়া করতে পারে না।মাথা ঘোরায়।অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।বাচ্চা হলে আরেক জ্বালা।এই বাচ্চার দায়িত্ব নিবে কে?
পারুলের মা কাউকে না জানিয়ে বাচ্চাটা এ্যাভরসন করে ফেললো।পারুলও জানে না।ঘরোয়াভাবে ফকিরের দেওয়া ওষুধ খাইয়েছিলো তাকে।বাচ্চা পড়ে গেল।পড়ে যাওয়া ভ্রূণ রান্নাঘরের পেছনে চিপা জায়গায় মাটিচাপা দিলো পারুলের মা।এসবই পারুলের মায়ের বুদ্ধি।

শ্বশুর বাড়ির সবাই শুনলো কথাটা।পারুল প্রথমে আড়াল করতে চেয়েছিলো।কিন্তু তার শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন দেখে শাশুড়ি সব জেনে গেল।মায়ের এমন কাজে পারুলও অসন্তুষ্ট।এতো কষ্টের ফল এভাবে শেষ করে দিলো তার মা।তাই কষ্ট পেয়েছে সেও।শাশুড়ি কঠিন গলায় বললো,এইডা তুমি কী করলা।এতোবড় সাহস তুমি পাইলা কই?
পারুল নিরুত্তর।মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।সে যেন আজ বিরাট অপরাধী।
প্রতিবেশী বাড়ির আরো দুই তিনজন মহিলা ছিলো।তারা শুনে এটা ওটা বলতে লাগলো।তার স্বামী শুনে তার শরীরে হাত তুললো।মেরে শরীরে দাগ বানিয়ে ফেললো।আর মুখে যা খুশি তাই বলতে লাগলো।এতো সুন্দর মেয়ে দুঃখে কষ্টে অল্পদিনেই বিশ্রী হয়ে উঠলো।আর সেইদিন থেকে শাশুড়িও তাকে বিষদৃষ্টিতে দেখতে লাগলো।আগে ছেলে বকাবাজি করলে ধমক দিতো,পারুলকে সান্ত্বনা দিতো।এই ঘটনার পর সেসব আর দেখা গেল না।দেখা গেল ছেলে পারুলকে বকাবকি করছে,গায়ে হাত তুলছে শাশুড়ি শুনেও শুনছে না।দেখেও দেখছে না।একটা চাপা ক্ষোভ সব সময়ই শাশুড়ির ভেতর লক্ষ্য করা যায়।অবস্থা এমন হল যে পারুল যেন শ্বশুর বাড়ির একটা বাড়তি ঝামেলা।বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার বিচার সালিসি হল।কিন্তু সালিসিতে তারা অস্বীকার করে না পারুলের ভরণপোষণ করবে না,দায়িত্ব নিবে না।বিচারে আগত লোকজন বুঝতে পারে না মেয়েটি নির্যাতিত হচ্ছে।তারা বলে মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিলে সমস্যা কোথায়?ঠিকইতো আছে সবকিছু।সবাই শ্বশুর বাড়ির পক্ষে কথা বলে।শাশুড়ি চালাক মহিলা।নিজেদের ঘাড়ে দোষ নিতে চায় না।কিন্তু তাদের ছেলে যে নেশাখোর সেটা তারা জানে।পরবর্তীতে পারুলের বাবা প্রতিবারই পারুলকে সাথে করে নিয়ে আসতে চাইলো।কিন্তু পারুলের ঐ এক কথা,দেহি ভালো অয়নি?বাড়ি গেলে শেষে পারুলের বাবা রাগ করে যোগাযোগই বন্ধ করে দিলো।বস্তত দিনের পর দিন এইসব ঝামেলায় নিমজ্জিত থেকে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল।

যাবার সময় তার বাবা কড়া ভাষায় বলে গেল সে আর এই বাড়িতে আসবে না।এতোবার নিতে আসার পরও যখন সে গেল না তাহলে পরবর্তীতে মরে গেলেও সে আর এই বাড়িতে তাকে নিতে আসবে না।
এই কথা শুনে পারুল শুধু চোখের পানি ফেললো।
শ্বাশুড়ি এখন তাকে খুটাও দেয়।ফকিন্নির বাচ্চা বলে গালি দেয়।পারুলকে বউ করে নেওয়ার সময় তাদের কোনো চাহিদা ছিলো না।কিন্তু এখন পারুলের বাপের বাড়ি থেকে কী দিয়েছে বলে প্রশ্নো তুলে।কিন্তু পারুলের বাবা যতোটুকু সামর্থ্য ছিলো;দিয়েছে।আলমারি দিয়েছে,খাট দিয়েছে লেপতোশক দিয়েছে।সেগুলো পারুলের ঘরে এখনও শোভা পাচ্ছে।

এপ্রিল মাস এলো।ঘন ঘন ঝড় বৃষ্টি হয়।বৃষ্টির চেয়ে বাতাসই বেশি।দেশে লোকের গাছে গাছে আমের মুকুল এসেছে।বাতাসে আমের মুকুল ঝরে যায়।ঝড় বৃষ্টির পর,পরই গাছের তলায় ঝরা আমের মুকুলের স্তুপ জমা হয়।পারুলের কিছুদিন ধরে শরীর অসুস্থ।প্রায় সময় জ্বর থাকে।মাসের পর মাস অযত্ন আর অবহেলায় শরীর ভেঙে পড়েছে।অনেকদিন হল বাড়িতে যোগাযোগ নেই।কেউ আসেও না।জ্বরের সাথে অল্প,অল্প কাশি আছে।তখন আবার করোনাকালীন সময়।বাড়ির লোকেরা সন্দেহ করে পারুলের করোনা হয়েছে বলে।তারপরও তাকে দিয়ে বাড়ির রান্নাবান্না করায়,কাজ করায় ।জ্বর বেড়ে যাওয়ায় পারুল আজ রান্না করতে পারলো না।শাশুড়িকে ডেকে কাঁপা গলায় বললো,মা আমার অনেক জ্বর।আমি রাঁন্না করতে পারুম না।
বলার সময় তার বারংবার কাশি আসতে লাগলো।অনেক কষ্টে কাশি সংবরণ করে সে কথা শেষ করলো।
পারুল কম্বল গায়ে দিয়ে বিছানায় তখন শুয়ে ছিল।পাটের আঁশের মতো জটা চুল এলিয়ে পড়েছিলো বালিশের ওপর।
শাশুড়ি তার দিকে বিষ দৃষ্টিতে তাকালো।পারুলের কথায় সে সন্তুষ্ট হতে পারে নাই।প্রকাশ করে তাই বললো,জ্বর আর আমাগো কোনোদিন আহে নাই।আমরাতো রান্দাবাড়া বন্ধ করি নাই।আল্লাদ।বাচ্চা ফেলে দেওয়ার খোটা এখনও দেয়।আর পারুলেরও দূর্ভাগ্য।তারপর আর বাচ্চা ধারণ করতে পারে নাই পেটে।অথচ তারপর অনেকদিন কেটে গেছে।শাশুড়ি রান্নার কাছে গেল না।সেটা লক্ষ্য করে পারুল অনেক কষ্টে উঠে এলো।স্বামী এসে ভাত তরকারি না পেলে সে আরেক হুলস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে দিবে।বাড়ির ভেতর এক চিলতে দুয়ার।একপ্রান্তে চিপার ভেতর ছোট রান্নাঘর।রান্নাঘরে চলা আছে।পারুল প্রতিদিন এই চুলায় রাঁন্না করে।হাড়িতে চাল তুলে ধুয়ে চুলায় তুলে দিলো।জ্বর এতো জাকিয়ে ধরলো যে আগুনের কাছে বসে থেকেও তার শীত করতে লাগলো।মুখ দিয়ে গরম ভাব বের হচ্ছে।এই সময় মাথায় পানি ঢালতে পারলে ভালো হতো।কিন্তু যেখানে তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না কেউ সেখানে সেবা পাবার আশা করাটা দুরাশা মাত্র।দূর্বল হাতে চলা গুঁজে দিলো চুলায়।
এই সময় প্রতিবেশী বাড়ির এক মেয়ে এলো।সে পারুলকে ভাবি বলে ডাকে।পারুলের এই অবস্থা দেখে সেই মেয়েটা পেঁয়াজ মরিচ কেটে দিলো।কপালে হাত দিয়ে দেখলো,অনেক জ্বর।তরকারি কেটে দিলো।পারুলকে বললো ভাবি তুমি শুয়ে থাকোগা।
কিন্তু পারুল গেল না।কিছু না বলে রান্নাঘরের খামের সাথে ঠেস দিয়ে পীড়িতে বসে রইলো।আর খুস,খুস করে কাশতে লাগলো।মেয়েটি রাঁন্নাবান্নায় সিদ্ধহস্ত।সে ভাত নামিয়ে তরকারির কড়াই চুলায় তুলে দিলো।নতুন দাড়া দিয়ে চিংড়ি মাছের ঝোল।মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো,ভাবি তোমাগো বাড়ি যাওনা কেন?বাড়ি থাইকা নিবার আসে না?
আসে।
তাইলে যাওনা ক্যাঁ?অনেকদিন ধইরাতো বাড়ি যাওনা।
ত্বরে পরে কমানি।
কওন লাগবো না ভাবি।আমি জানি সব।তোমার সাথে রাগ কইরা তোমার বাপে তোমারে নিবার আহে না।আমি হুনছি।
পারুল কিছু বললো না।

তার সাথে যে একেবারে যোগাযোগ নাই সেটা না।বাবা মায়ের সাথে পারুলের খালার সাথে যোগাযোগ আছে।কয়েকবার পারুলদের বাড়ির নাম্বারেও ফোন দিয়েছিলো।বাড়ির ফোনটা সব সময় পারুলের জামাইয়ের হাতে থাকে।পারুলের জামাই শশুর শাশুড়ির নাম শুনতে পারে না।ফোন দেওয়া পছন্দ করে না।পারুলদের বাড়ি থেকে ফোন দিয়েছে শুনলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়।একদিন ফোন ধরে পারুলের জামাই এমন বকাবাজি করলো যে এরপর আর ফোন দেয়নি।এরপর খালার মাধ্যমেই বাবা মা তার খোঁজ খবর নেয়।পারুল সেটা জানে।খালা দুই একদিন পর পরই ফোন দিয়ে তার সাথে কথা বলে।পারুল বলে সে ভালোই আছে।তবে আসল খবর খালারও অজানা নয়।খালাও তাকে চলে আসতে বলে।পারুল যায় না।

রাত তখন দশটা বাজে।পারুল ঘরের দরোজা ভিড়িয়ে শুয়ে পড়েছে।লাইট নেভায়নি।গরমের দিন তবু দুটি কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়েছে সে।রাতে জ্বর আরো জেঁকে ধরেছে তাকে।এমন সময় পারুলের স্বামী ঢুকলো ঘরে।প্রতিদিন সে এমন রাত করেই ঘরে ঢুকে।পারুল কোনো প্রশ্নো না করে ভাত বেড়ে দেয়।জ্বর নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে আজও ভাত বেড়ে দিলো।
পারুলের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু না জিজ্ঞেস করে উল্টো তার রাঁন্নার দোষ ধরতে লাগলো।ভাত বেশি ফুটে গেছে।এমন ফুটা ভাত সে খেতে পারে না।
সত্যি, সত্যি ভাতটা আজ বেশি ফুটে গেছে।মেয়েটি বুঝতে পারেনি।সঠিক সময়ে ভাতের মাড় গালতে পারেনি।আর কথা বলার তালে পারুলও বলতে পারেনি।
পারুল সেটা স্বীকার করে বললো,আইজকার মতন খান।আর এমন অইবো না।বলেই সে আবার কম্বল গায়ে দিলো।জ্বরের ঘোরে সে বসে থাকতে পারছিলো না।
তার স্বামী কিন্তু সেটা শুনলো না।সে ভাতের প্লেট ঠেলে দিয়ে বললো,মাগী রান্দার সময় মন কোথায় রাহস।তর কোন ভাতারের সাথে গল্প করস।
পারুল উঠে বাইরে গেল।একটু পরই সে এক প্লেট ভাত নিয়ে ঘরে ঢুকলো।পাশের বাড়ি থেকে ভাত নিয়ে এসেছে।স্বামীকে সামনে ভাতের প্লেট রেখে বললো,এই ভাত খান।
কিন্তু স্বামী সেই ভাতও খেতে রাজি হল না।নিজের বাড়ির ভাত থাকতে পরের বাড়ির ভাত খাবে কেন।সে পারুলকে তার বাবা মা তুলে গালাগালি করতে লাগলো।পারুল অনুরোধ করে বললো,দ্যাহেন আমার শরীরডা ভালো না।জ্বরে আমি ঠিক থাকা পারি না।আপনে আমার সাথে এমন কইরেন না।কিন্তু স্বামী সেই কথা কানেই তুলে না।এই কথা শুনে সে আরো ব্যগ্র হয়ে উঠলো।সেদিন সে হয়তো নেশাপানি করে এসেছিলো।বাবা মা তুলে কথা বলায় পারুলও স্বামীর কথার জবাব দিতে লাগলো।ক্লান্ত দেহে,বিষণ্ণ মনে আজ সে সহ্য করতে পারছিলো না।সেও স্বামীর কথার প্রতিবাদ করে উঠলো।সঙ্গে, সঙ্গে পারুলকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিচে নামিয়ে আনলো।তারপর কিল ঘুষি মারতে লাগলো সারা শরীরে।ও ঘর থেকে পারুলের শাশুড়ি দৌড়ে এলো।কী অইসে,মারস ক্যাঁ?স্বামী তাকে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো,মুখে মুখে তর্ক করে।ওর কতো বড় সাহস
শাশুড়ি বললো,মুখটা বন্ধ রাখলে কী অয়।স্বামীতেতো কতো কিছুই কয়।তাইতে কী মুখে,মুখে তর্ক করন যায়?
পারুলের তখন কথা বলার মতো অবস্থা নেই।কিল-ঘুষি আর জ্বরের প্রকোপে সে প্রায় অচেতন।শাশুড়ি তবু তার কাছে এলো না।কিন্তু পারুল শাশুড়ির সব কথা স্পষ্ট শুনতে পেল।তবে কোনো উত্তর দিলো না।মানসিক এবং শারীরিক যন্ত্রণায় আজ সে চরমভাবে বিপর্যস্ত।

ঘরের ভেতর বেড়ার সাথে টাঙানো একটা ওয়াল ঘড়ি ছিলো।দরোজার মুখে দাঁড়ালেই ওয়াল ঘরিটা চোখে পড়ে।ঘড়িটার কাটা তখন দেড়টার ঘরে।এই বাড়ির কেউ জেগে নেই।বাইরে দুয়ার আলো করে লাইট জ্বলছে।পারুল দরোজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলো।সারারাত সে ঘুমায়নি।চোখমুখ ফুলে আছে।কাঁন্না করেছে সারারাত।রান্নাঘরে এসে খড়ির মাচা থেকে একটা মোটা দড়ি হাতে নিলো।তারপর এক মূহুর্ত দেরি না করে দুয়ারের পাশে জাম গাছের ডালের সাথে গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে পড়লো।সকালবেলা সবাই দেখলো পারুলের নিথর দেহ ঝুলছে জাম গাছের ডালার সাথে।জিহবাটা প্রায় আধা হাত বেড়িয়ে এসেছে।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...