ভদ্রলোক

আবদুল্লাহ আল জাবের

গুলিস্তানের মেইন রোডের পাশে দাড়িয়ে আছে আবিদ। গন্তব্য মিরপুর-১৪। বিশ মিনিট গত হতে চলেছে এখনো কোনো বাসের নাম গন্ধ নাই। নিদারুণ উৎকণ্ঠায় ভিতরটা অস্থির হয়ে উঠছে। এদিকে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া সূর্যটাও আস্তে আস্তে হারাতে বসেছে নিজেকে। অন্যদিকে আবিদের বুকের ধুকপুকুনি ক্রমশ বেড়েই চলছে। কারণ, মাগরিবের আগে মাদরাসায় হাজির না হতে পারলে, পড়তে হবে কঠিন শাস্তির মুখে। প্রতিটি মুহূর্তে তাই ছেলেটির ভাবনার দুয়ারে নানা শঙ্কা কড়া নাড়তে থাকে। এমন সময় ‘শিকড়’ নামের একটি বাস আসে বটে কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তাতে এতো মানুষ তিল ধারনের ঠাঁই মাত্র নেই। বরং কিছু মানুষ তো বাঁদরের মতো ঝুলেই গন্তব্যে রওনা হয়েছে। এই দৃশ্য আবিদের মনে আশার তরঙ্গকে হতাশায় পরিণত করল।

অপেক্ষার প্রহর আরো দীর্ঘ হতে থাকে। এখন কী উপায়, যাবে কিভাবে, এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোত্থেকে আচমকা মধ্যবয়সী এক লোক আবিদের সামনে এসে হাজির। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট আর পায়ে সদ্য কালি করা একজোড়া জুতা। ডান হাতে কালো রাঙা অফিসব্যাগ। আগাগোড়া দেখতে লোকটিকে ভদ্র গোছের বলেই মনে হলো। এসেই ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল, হুজুর! দীর্ঘক্ষণ হলো এখানে দাড়িয়ে আছেন দেখছি, কোথাও যাবেন মনে হয়?

আবিদ বিরক্ত ঝারা গলায় বলল, আঙ্কেল! আর বইলেন না, সেই আধ ঘন্টা হলো দাড়াইয়া আছি বাসের জন্য কিন্তু কি আর বলবো দেখছেনি তো রাস্তায় একটা বাসও নাই। যাবো মিরপুর….

কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, মিরপর? কত নম্বর?

‘১৪ নম্বর’। আবিদের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

পরবর্তী কথা বিনিময়ের আগেই দাঁতের শুভ্রতা ছড়ানো একগাল হাসি ঝুলিয়ে বলল, ও ১৪ নম্বর! আমিও তো সেখানেই যাবো। আপনি আমার সাথে যেতে পারেন।

দ্বিধাদ্বন্দ্বে পরে যায় আবিদ। প্রকাশ্যে আগ্রহ না দেখিয়ে বরং এ বিষয়ে আর কথা না বাড়াতেই ছেলেটি চুপ থাকল। লোকটি তো নাছোরবান্দা। আবিদের উত্তরের অপেক্ষা না করে হয়তো কিছুটা আশ্বস্ত করতেই আবার জিজ্ঞাসা করে বসল, মিরপুর-১৪ নম্বর মোড়ের বড় হাসপাতালটা চেনেন?

গ্রাম থেকে আসা ছেলেটি গত দেড় মাস হলো মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী জামেউল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হয়েছে। এখনো তেমন কিছু চেনেনা। তবে এক সহপাঠীর নিকট শুনেছিলো মিরপুর-১৪ নম্বর মোড়ে একটি হাসপাতাল আছে। সেই সুবাদে মাথা নাড়িয়ে ইতিবাচক জবাব দিলো।

লোকটি তখন একপ্রকার জোর দিয়ে বলল, ওই হাসপাতালেই আমি কর্মরত আছি। সেখান থেকে আমার জন্য একটি গাড়ি আসছে। আপনি চাইলে আমার সাথে যেতে পারেন।

ভদ্রতার খোলসে হরহামেশাই যে গুলিস্তানের প্রতারকচক্র মানুষের মুল্যবান বস্তু হাতিয়ে নেয়। একথা মানতে দ্বিধা নেই। কিন্তু বড় কথা হলো, এসবের আড়ালে মানুষের বিশ্বাসটাও হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। অর্থাৎ এখানে বিশ্বাস বলতে কিছু নেই। কোনো অপরিচিত লোককে বিশ্বাস করাটাই দায়। কিন্তু এই লোকটি ঠিক উল্টো। তার মাঝে প্রতারণার লেশমাত্র নেই। কী অমায়িক তার ব্যবহার! তাছাড়া তার গলায় লোটকে থাকা হাসপাতাল কর্তৃক প্রদত্ত একটি পরিচয়পত্রও সততার জানান দিচ্ছে। মোটকথা তাকে একজন পরোপকারী ভাবাই শ্রেয়। তবু আবিদের মন সায় দিচ্ছে না। এদিকে কোনো বাসও আসছে না। কিন্তু যে কোনো উপায়ে মাগরিবের আগে পৌঁছতে হবেই মাদরাসায়। নয়তো শিক্ষকের কড়া শাসনের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে। সবমিলিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যায় ।

ছেলেটি তাই সাত-পাঁচ না ভেবে অগত্যা অপরিচিত লোকটির সাথে যেতেই মনস্থির করল এবং লোকটিকে বলল, আচ্ছা যাবো আপনার সাথে।

লোকটি তখন নরম গলায় বলল, আচ্ছা হুজর! আপনার সাথে তো টাকা আছে তাই না? ‘হ্যাঁ, কিন্তু কেন?’ ছেলেটি শঙ্কিত গলায় বলল-সন্দেহজনক ঠেকল ব্যাপারটা।

‘গাড়িটি তো আসলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তাদের নির্দেশ, বাইরের কাউকে উঠানো যাবে না। কিন্তু আপনার যেহেতু তাড়া আছে তাই ড্রাইভারকে বলে-কয়ে রাজি করাতে পারবো যে, আপনার কাছে টাকা নেই । কিন্তু আপনার পাঞ্জাবিটা সূতি কাপড়ের হওয়ায় টাকাগুলো বাহির থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাই বলছিলাম আর কি টাকাগুলো আড়াল করে রাখতে।’

‘আমার কাছে তো মানিব্যাগ নাই যে টাকাগুলো তাতে রাখবো।’ উৎকণ্ঠিত গলায় বলল আবিদ।

‘কোনো চিন্তা নেই। এক কাজ করেন, টাকাগুলোকে একটি টিস্যুতে বা কাগজে পেঁচিয়ে নিন। তাহলে আর দেখা যাবে না।’ কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে অভয় দিয়ে বলল লোকটি।

আবিদের কাছে পেঁচানোর মত কিছু না থাকায় নিরূপায় হয়ে লোকটিকে বলল, আমার কাছে তো পেঁচানোর মত কিছু নেই আপনি যদি একটু সাহায্য করতেন।

লোকটি ব্যাগ থেকে একটি ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকা বের করে তার কিছু অংশ ছিড়ে পেঁচিয়ে দিল টাকাগুলো। অতঃপর আবিদ টাকাগুলো সযত্নে রেখে দিল তার পাঞ্জাবির পকেটে।

কিছুক্ষণ পর লোকটিকে কেউ একজন ফোন করলে ব্যস্ত কন্ঠে আবিদেকে বলল, একটু দাড়ান! আমি আসছি। ফোনে কথা বলতে বলতেই লোক সমাগমের দিকে পা বাড়াল লোকটি। ১৬-১৭ মিনিট কেটে গেলেও লোকটির ফিরে আসার নাম নেই। এদিক-ওদিক ফিরে একরাশ বিরক্তি নিয়ে আবিদ নিজের নেভি-ব্ল রঙের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সময় ছয়টা আটচল্লিশ। আর তিন থেকে চার মিনিট পরেই হয়তো ভেসে আসবে মাগরিবের আযান।

তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে পায়চারি করতে থাকে আবিদ। মিনিটখানেক পরে একটি বাস এসে ব্রেক কষে আবিদের সামনে। অন্য সবার সাথে আবিদও তাতে হুড়মুড়িয়ে উঠে পরলো। লোকটির কথা ওই মুহূর্তে মাথা থেকে একেবারে উধাও হয়ে যায়। সিটে গিয়ে বসতেই দীর্ঘক্ষণ অব্দি দাড়িয়ে থাকার ক্লান্তি কিছুটা হলেও প্রশান্তি বয়ে আনে। পরক্ষণেই লোকে টুইটুম্বুর বাসটি আপন গতিতে চলতে থাকে।

থমে থমে চলতে থাকে বাসটি। এমন সময় সন্ধ্যার আকাশ-বাতাসকে মুখরিত করে ভেসে আসে আযানের মোহনীয় সুর। আযানের ধ্বনিতে সবার তন-মনে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গলেও আবিদের কাছে তা দুশ্চিন্তার মেঘে বজ্রপাতের মত মনে হচ্ছিল। নানা শঙ্কা একে একে ভীড় করতে থাকে আবিদের হৃদে- মাদরাসার গেট খোলা পাবো তো নাকি সেখনে কড়া নজরদারি চলছে! নামাজের পর রুমের হাজিরায় উপস্থিত না হতে পারলে গুনতে হবে মোটা অংকের জরিমানা। এসব ভাবছে আর একনাগাড়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। হাঠাৎ ভাব জগতের ছন্দপতন ঘটিয়ে ছোকরা হেলপারটি বলে উঠল, হুজুর! মিরপুর যাইবেন না? ভাড়াটা দেন।

অনেকটা বিরক্তি নিয়ে পকেট থেকে পেপারাবৃত টাকাগুলো বের করল আবিদ। পেপার খোলা মাত্রই মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। একি! টাকাগুলো গেল কোথায়? পাঁচশত টাকার ছয়-ছয়টি নোটের একটিও নেই! টাকার স্থলে টাকার সমানাকৃতির কিছু পেপার টুকরো! টাকাগুলো কে নিল? কিভাবে নিল? কখন নিল? মনে হাজার প্রশ্নের জিজ্ঞাসা। মুহূর্তেই জগতের সমস্ত আধাঁর ঘিরে নেয় আবিদকে।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...