পেয়ে হারালাম

নাদিয়া রিপাত রিতু

এক ঘর মানুষের সামনে একটা মহিলা হঠাৎ বলে উঠলো ,এটা কী সেই বউ টা যার বাচ্চা হয়না ?

নূরের হাসি খুশি মুখ হঠাৎ মলীন হয়ে গেলো ।

মহিলা টা আবার বলে উঠলো: কয় বছর হলো বিয়ের? প্রতি উত্তরে নূরের দূর সম্পর্কের ননদ বললো এই তো দশবছর হলো। তখন মহিলা টা বললো :এত বছর যখন হয়নি আর হবেনা বাচ্চা।

নূরের মন খারাপ দেখে নূরের চাচী শাশুড়ি বললো: অনেকের তো দেরিতে হয় আল্লাহ যেদিন চাইবে সেদিন দিবে।

নূরের দূর সম্পর্কের ননদ বললো :ভাইয়া কে বলছি আরেকটা বিয়ে করো ভাইয়া তো শুনছেনা কারো কথা ।

নূর চুপ করে সবার সব কথা শুনছিলো কিছু বলতে পারছেন।আরেকদিন এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে ওখানে বাচ্চারা দুষ্টামি করছিলো তখন একজন আত্মীয় বললো তোমার বাচ্চা নেই যে ভালো আছো শান্তিতে আছো।আমার বাচ্চারা আমাদের মাথা খেয়ে পেলছে নূরকে বললো।

কথাটা হয়তো আমাদের কাছে সাধারণ লাগলেও যার বাচ্চা নেই তার কেমন লাগবে,সেই জানে কথাটার গভীরতা কতটুকু ।

নূর মুচকি একটা হাসি দিয়ে ওখান থেকে চলে গেলো।

এরপর নূরের শাশুড়ি বললো: আমি বউমাকে বলে দিয়েছি বাচ্চার জন্য আর চিকিৎসা করতে পারবোনা। অনেক টাকা খরচ করেছে আমার ছেলে। এখন নিজের বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে চিকিৎসা করাও।

ঘরে সব কাজ নূর সামলায় বাচ্চা নেই বলে ওকে সবার কত কথা সহ্য করতে হয় । নূর আর নীলের সংসার দশবছরের । শুধু একটা বাচ্চা হচ্ছে না এছাড়া আর কোনো দুঃখ নেই ।

ওর একমাত্র আশ্রয়স্থল আল্লাহ।রোজ মোনাজাতে দোয়া করে ওকে আল্লাহ যেন মা ডাক শুনায় দশবছর ধরে মানুষের কথা শুনতে শুনতে ও যে ক্লান্ত। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে সবাই যে বাচ্চার কথা বলে ও যে সহ্য করতে পারেনা।হাসবেন্ড প্রবাসী তার মধ্যে কত জনে কত কথা বলছে, ওর বাচ্চা হলে ক্লাস ফাইভে পড়তো আরো কত কি ।কেউ বুঝতে চাইনা কতটা খারাপ লাগে একটা মেয়ের এসব কথা শুনতে।

মাজার, হুজুরের পানি পড়া কোনো কিছু বাকি রাখেনি। নূরের হাসবেন্ডের বাচ্চা অনেক পছন্দ আর নূরের ও।কিন্তু আল্লাহ যে কেন দশবছর ধরে পরীক্ষা দিচ্ছে আল্লাহ ভালো জানেন।যে যা বলেছে সব করেছে শুধু একটা বাচ্চার আশায়।

নূরের মনে শুধু একটা ধ্বনি

কখন শুনবো আমি ঐ

মা নামে মধুর ধ্বনি ।

কখন কোল জুড়ে আসবে

ছোট্ট সোনামণি।

কেউ না চেয়ে ও পেয়ে যায়

;মা হওয়ার সুখ

আর কেউ কেঁদে ও পাইনা

দেখতে সন্তানের মুখ।

জানেন‌ একটা মেয়ে কখন পূর্ণতা পায়।যখন সে সন্তানের মা হয়,মা হওয়ার আগে একটা মেয়ে যতই সফল হোক, পূর্ণতা পায়না।মা ডাক সব মেয়ের শুনতে ইচ্ছে করে।

বিয়ের পর বছর দুয়েক যে মেয়ের বাচ্চা হয়নি ।সেই জানে ,অপূর্ণতা কাকে বলে। হাসবেন্ড যদি প্রবাসী হয় তাহলে তো আর কোনো কথা নেই।বউটাকে শুনতে হয় বাচ্চা হচ্ছে না কেন বাচ্চা কখন‌ হবে এই কবিরাজের কাছে যাও ঐ ডাক্তারের কাছে যাও ।এটা করো ওটা করো,কত শত কথা ।তোমার মাকে বলো ডাক্তার দেখাতে, ওটা করতে।আরে সমস্যা কি এসব মানুষের আমার বাচ্চা কি আপনারা এসে লালন পালন করে দিবেন।আর আমার মা কেন করবে,বংশ যার বাড়বে সে করবে।নাকি সব দায়িত্ব মেয়ের মা- বাবাদের।আহারে স্বার্থপর সমাজ।

কেন এটা বুঝেনা,তারা তো চেষ্টা করছে না হলে কি তাদের দোষ।বাচ্চা হওয়া না হওয়া তো সব সৃষ্টি কর্তার হাতে ।এটা অনেক মানুষ মানে বিশ্বাস ও করে । কিন্তু ঐ যে বাড়ির বউটাকে খোঁচা দিয়ে কথাটা ঠিকি বলে।

নূর দশবছর ধরে মানুষের কথা শুনতে শুনতে এক প্রকার পাথর হয়ে গেছে ‌।কয় জন কে এড়িয়ে চলবে। হাসবেন্ড নীল প্রবাস থেকে এসেছে।এইবার ও এক বুক আশা নিয়ে নূরের ডাক্তারের চিকিৎসা হুজুর সব দিকে চেষ্টা করেছে ।মাসে মাসে দামী দামী ঔষধ ইনজেকশন নিতে হয় ।শুধু মাত্র একটা সন্তানের আশায়।কিন্তু মাসের শেষে বার বার হেরে যায় ।আর কান্না করা ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। সবাই জিজ্ঞেস করে এবার কি হলো ; সুখবর কখন দিচ্ছেন।

নূরের শাশুড়ি বলে ,বউমা এবার যদি তুমি বাচ্চা দিতে না পারো ।আমার ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করাবো। তখন নূরের বুকটা ফেটে যায় ।সেদিন রাতে নূরের ঘুম আসছেনা।

তখন সে তার স্বামী নীলের কাঁধে মাথা রেখে বলে, তুমি আরেকটা বিয়ে করে নাও ।নীল আমি তোমাকে সন্তান দিতে পারবোনা।

নীল বলে উঠে মানুষ কী শুধু সন্তানের জন্য বিয়ে করে ।আল্লাহ যদি চাই আমাদের সন্তান হবে আমি শুধু তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই নূর ।আমি তোমার মত করে আর কাউকে ভালোবাসতে পারবোনা নূর । আল্লাহর উপর ভরসা রাখো আমরা একদিন ঠিক মা-বাবা হবো ।আর যদি না ও হয় আমি তোমাকে নিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিবো ।

মানুষের এত কথা শুনার পর ও নীলের কথা গুলো নূরের মনে আশা জাগায় সে হার মানে না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখে আল্লাহ হয়তো তার দোয়া কবুল করে নেই । দশবছর পর কনসিভ করে তার খুশির দিন শুরু । দশবছর আল্লাহ পরিক্ষা নিয়েছে সেই পরীক্ষা নূর আর নীল সফল হয়েছে।আজ তার কোল আলো করে আসে এক পুত্র সন্তান। দশবছর পর এর চেয়ে বড়ো পাওয়া আর কিছুই হতে পারেনা।

নূরের নয়নের মণি এই বাচ্চাটা তাই ওর নাম দেয় নয়ন ।নূর আর নীল খুশি হয়ে বাচ্চার আকিকা করায় অনেক বড়ো করে ।

অনেক মানুষ আসে আকিকাতে ।

নূর এত খুশি ছিলো যা বলে বুঝানোর মত না আকাশের চাঁদ যেন‌ পেয়েছে ।

নূর একটু চোখের আড়াল করেনা বাচ্চাকে সারাক্ষণ বাচ্চাকে চোখে চোখে রাখে।

এইভাবে পাঁচ মাস চলে গেলো একদিন বাচ্চার প্রচন্ড বমি পায়খানা হয়।ছোট বাচ্চা এতে ভিষণ দুর্বল হয়ে পড়ে। বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করায় ।নূরের সেই কী কান্না কত আকুতি মিনতি।তা ও শেষ রক্ষা হলো না । বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারলো না নূর ।কোল থেকে চিরকালের মতো বিদায় নিলো ওর কোল থেকে ওর নয়নের মণি ।

কিভাবে মনকে বুঝাবে নূর না পাওয়ার চেয়ে “ক্ষণিকের জন্য পেয়ে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা যে বেশি।”

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...