শুকতারা ভাতের হোটেল

অলোক আচার্য

শুকতারাকে আপনারা চিনবেন না। চেনার কথা না। কারণ শুকতারা বিখ্যাত কেউ না। শুকতারার ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না। সমাজের বড়ো বড়ো মানুষজন শুকতারার খোঁজ খবরও নেন না। শুধু ভোটের আগে শুকতারাদের দরকার হয়। মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে নেতারা প্রশংসা করে। শুকতারা তখন দম বন্ধ করে শুনে যায়। শুকতারা জানে, এসবই হচ্ছে কথার কথা। ভোটের পর আর কাউকে খুঁজে পাবে না সে। জীবনে তো কম ধাক্কা খায়নি সে! কতবার এলাকার নেতাদের দ্বারস্থ হয়েছে। কাউকে পাশে পায়নি। একদিন একজন সাংবাদিক এসেছিল শুকতারাকে সংবাদে দিতে। শুকতারার সংগ্রামের গল্প লিখতে চায়। শুকতারার প্রবল আপত্তির কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। শুকতারা জানে এটাও আজকাল ব্যবসা। ভিউ ব্যবসা। এই ব্যবসা দিয়ে সে মিডিয়ার সামনে আসতে চায় না। শুকতারার টিকে থাকা শুধুই শুকতারার। ফলে দেশের মানুষের আর শুকতারার গল্প জানা হয়ে ওঠে না। শুকতারা খুব সাধারণ নারী। বয়সের হিসেবে মধ্যবয়সী মহিলা বলা যায় অথবা যৌবনা নারীও বলতে পারেন। তবে এসবই নির্ভর করে সেই নারীর জীবন কিভাবে কাটছে তার উপর। শুকতারার সংসার অর্ধেক। মানে স্বামী নেই। দশ বছর আগে শুকতারার স্বামী মারা যায়। স্বামী যাওয়ার আগে উপহার হিসেবে শুকতারার পেটে একটা মেয়ে রেখে গিয়েছিল। সম্পত্তি বলতে শশুড়বাড়ির সোয়া তিন শতাংশ ভিটে। বাড়ি বলতে সেই ভিটের উপর বহু জরাজীর্ণ টিনের ঘর। আর স্বামীর রেখে যাওয়া সেই মেয়েটাই শুকতারার বাকি আকাশ। মেয়েটাকে নিয়েই সে বাকি জীবনের স্বপ্ন দেখে। এর সাথে অবশ্য আরও একটা বিষয় আছে। যা এই দুইজনের স্বপ্নকেই বাঁচিয়ে রেখেছে। সেটি হলো শুকতারা ভাতের হোটেল। নাম শুনেই বোঝা যায় এটা কোনো নামী-দামী রেস্তোরা নয়। বরং এটা ঢাকা শহরের অসংখ্য ফুটপাতের পাশে বিক্রি হওয়া ভাতের হোটেলগুলোর মধ্যে একটি। এখানকার ভাত স্পেশাল কিছু না। শুকতারার হাতের ছোঁয়ায় সব স্পেশাল হয়ে যায়। কয়েক পদের সবজি, ভর্তা আর হাঁসের মাংস এই হরো শুকতারার হোটেলের খাদ্য।
স্বামীছাড়া একা একটা মেয়ে মানুষ হোটেলের ব্যবসা শুরু করা সহজ ছিল না। বেশ কঠিন ছিল কাজটা। এখানে পরিশ্রম করে উপরে উঠতে চাইলেও সেটি হয় না। সবার চোখ থাকে শুকতারার ভরাট শরীরটা দিকে। অভাব থাকলেও শরীরটা যেনো কোনোভাবেই মানানো যায় না। তরতর করে ঘাম ঝরে। ভাতের ব্যবসার আইডিয়াটা আসে একদিন ফুটপাত ধরে হেঁটে যাওয়ার সময়। শুকতারার মনে হলো এই শহরে অসংখ্য মানুষ কাজের চাপে বাড়িতে খেতে যেতে পারে না। এদের অধিকাংশই রাস্তার পাশে এসব ফুটপাতে গড়ে ওঠা সস্তার হোটেলগুলোতে দিন-রাতের উদরপূর্তি করায়। এটি করতে খুব বেশি অর্থেরও দরকার হবে না। কয়েকদিনের মধ্যেই টিনের মধ্যেই শুকতারার ভাতের হোটেল ফুটপাতে শুরু হয়। সেই দোকানের একটা সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। সাইনবোর্ডে লেখা শুকতারা ভাতের হোটেল। খুব ধীরে ধীরে শুকতারার ভাতের হোটেলের ভিড় বাড়তে থাকে। নি¤œজীবি মানুষের তিন বেলার খাওয়ার জন্য শুকতারার হোটেলকেই বেছে নেয়। কাষ্টমারদের কথায়, শুকতারার হারে রান্নায় জাদু আছে। একবার মুখে দিলে এখানেই আসতে হয়। শুকতারার হোটেলের সুনাম বৃদ্ধির সাথে সাথে আশেপাশের এতদিন ধরে চলা হোটেলের বিক্রি কমতে থাকে। তারা সবাই শুকতারার উপর ক্ষেপে যায়। সামনাসামনি কিছু না বলতে পারলেও ওরা শুকতারার হোটেলটা বন্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। স্বামী ছাড়া একজন মহিলার যে কি পরিমাণ যন্ত্রণা তা শুকতারা বলে বোঝাতে পারবে না। শুকতারার আশেপাশে হায়েনাদের ভিড় বাড়তেই থাকে। কেউ কেউ রসালো আলাপ জমাতে চায়। কেউ গায়েও হাত দিতে চায়। আকারে-ইঙ্গিতে অনেক কথা বোঝাতে চায়। সেদিন তো ফজর ঘরের ভিতর ঢুকেই হুমকি দিয়ে গেছে। শুকতারা বিকেলে বাড়ি ফিরে একটু গা-টা এলিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। বুকের ওপর থেকে শাড়ীর আঁচলটা সরে গেছে। চোখেও ক্লান্তির ঘুম। এমন সময় দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে ফজর। শুকতারার দুই ঘর পিছনেই থাকে। প্রতিদিন সকালে-বিকালে আকারে-ইঙ্গিতে অনেক কথা বোঝাতে চায়। শুকতারা বুঝেও না বোঝার ভান করে। এক নম্বরের মাতাল আর লম্পট একটা। ঘরে নতুন নতুন মেয়ে আনা স্বভাব। দুটো বউ টিকেনি। এখন নজর শুকতারার দিকে। শুকতারা জানে একবার কোনোভাবে প্রশ্রয় দিলেই সর্বনাশ! দুর্বল হলে চলবে না। শুকতারা বোঝে জীবন এভাবে কাটবে না। একজন তো কাউকে দরকার। কিন্তু সে ফজরের মতো কেউ না। এমন একজন যাকে সত্যিই ভরসা করা যায়। মেয়েটাকে নিয়ে নিশ্চিন্তে বাঁচা যায়। এই সমাজে এরকম মানুষের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। শুকতারা খোঁজে না। ভাগ্যে থাকলে এমনিতেই আসবে। দরজাটা প্রায় নিঃশব্দে খুলে ফেলে ফজর। ফজরকে দেখে ধরফর করে উঠে বসে শুকতারা।
কি চাই আমার ঘরে? ক্যান আইছিস হারামজাদা? প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দেয় ফজরের দিকে।
জবাবে ফজর কিছু বলে না। একটা বিশ্রী রকরে হাসি দেয়। সেই হাসিতে শব্দ হয় না। কেবল চোখগুলো চিকচিক করতে থাকে।
আমি কিন্তু চিৎকার দেবো।
দে, চিৎকার দে। আমি শুনি তর চিৎকার! সবাই আইসা তরে আর আমারে দেইখা ফালাইবো। তারপর! ফজর হাসতে থাকে। আমি ওগোরে কইবো, তুই আমারে ডাইকা আনছোস!
যা হারামজাদা, যা!
ফজর কুৎসিতভাবে হাসতে থাকে। শোন্, আমি তোরে এমনে কোনো কিছু করবো না। আমি তোরে বিয়া করবার চাই। যা করবার বিয়া করার পর। এসব বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় ফজর। যাওয়ার আগে ফজর নেকড়ে দৃষ্টি দিয়ে শুকতারার দিকে তাকায়। শুকতারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। পৃথিবীতে স্বামী ছাড়া একটা মেয়ে যে কতটা অসহায় হাড়ে হাড়ে টের পায় সে।
আজ সকাল থেকেই দোকানে ভিড়-ভাট্টা অন্যদিনের থেকে বেশি। একা চাপ সামলাতে পারছে না শুকতারা। আজ অফিসের লোকজন আগেই এসে পরছে। হাঁসের মাংসটা এখনও রান্না হয়নি। শুকতারা প্রাণপন চেষ্টা করছেন হাঁসের মাংসটা রান্না করতে হবে। এই আইটেমটা খুব চলে। এর মধ্যেই হোটেলে এসে বসে ফজর। আজ বেশ ফিটফাট হয়ে এসেছে। শরীর থেকে কড়া সেন্টের গন্ধ আসছে। এসেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে কলস থেকে জল ঢেলে নেয়।
কি রে শুকতারা, আইজ বেচাকেনা কেমুন? হাঁস ভুনা হইছে। তর হাঁসভুনা খাইতে মন চায়! ফজরের কথায় শুকতারার পিত্তি জ্বলে যায়। মুখে কিছুই বলে না। কাষ্টমার আছে। এক প্লেট ভাত আর হাঁস ভুনা নিয়ে ফজরের সামনে রাখে শুকতারা। খাওয়া শেষেও ফজর উঠে যাওয়ার কথা বলে না। পকেট থেকে একটা পান বের করে। এতক্ষণ শুকতারা মুখ বুজে সব সহ্য করেছিল। এবার আর পারলো না। কাষ্টমারের ভিড় খালি দেখে, বেশ জোর গলায় বলে উঠলো, তুই বাইরে যা ফজর। ভালো হইবো না কিন্তু! বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু লোক ডাকুম।
লোক ডাকার কথা শুনেও ফজরের কোনা ভাবান্তর হয় না। সে নির্বিকার হাসি হাসি মুখ করে বসে থাকে। মুখের পানের রস এক দিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
শুকতারা!
শুকতারা তখন ক্যাশের টাকা গুনছিল। ফজরের ডাক শুনে ঘুরে তাকায়। তুই যাস না!
দোকানডা আইজকার মতো বন্ধ কর শুকতারা।
দোকন বন্ধু করমু কেন্?
আইজ তর সাথে সিনেমা দেখবার যাবো। যে সে সিনেমা হলে না, সিনেপ্লেক্সে!
আমি তর লগে কোথাও যামু না। তুই যা ফজর।
ফজর এবার উঠে শুকতারার কাছে আসে। শুকতারা তখনও ক্যাশে বসা। লোকজনের ভিড় এখন আর নেই। দুপুর পেরিয়ে গেছে। ফজর কোনো কথা না বলে ঢিলেঢালা প্যান্টের দুই পকেট থেকে কয়েক বান্ডিল টাকা নিয়ে শুকতারা দিকে ছুঁড়ে দেয়। এত টাকা দেখে শুকতারা প্রথমটায় বেশ থতমত খেয়ে যায়।
এত টাকা! বিস্ময়ে বলে ওঠে।
শোন শুকাতারা এইসব টাকা তোর।
আমার?
হ, তোর।
তয় শর্ত হইলো আমাকে তর বিয়া করন লাগবো। এই হোটেলটা আমি আরও ভালো কইরা বানাবো। মানে পাকা কইরা দেবো। তুই রাঁধবি আর আমি কাষ্টমার সামলামু। শোন, আমার অতীত নিয়া আর ঘাঁটাঘাটি করিস না। আমি তরে পাইলে আর কাউর পিছনে যাবো না।
তর ফাঁদে আমি পা দিমু না রে ফজর। তুই যা।
আমার কথাটা ভালো কইরা ভাইবা দেখ শুকতারা। আইজ সিনেমা না দেখি। তুই ভাইবা দেখ। কাইল আমারে খবর দিস। আইজ যাই। আর টাকাগুলান তর কাছেই রাখ। না রাখলে কাইল ফিরত দিস!
শুকতারা কোনো কথা বলে না। টাকাগুলো রেখে চলে যায় ফজর। ফজর চলে যাওয়ার পর শুকতারা টাকাগুলো গুণে দেখে। পাঁচ লাখ টাকা। এত টাকা বাপের জন্মেও হাতে নেয়নি সে। আজ নিজের হাতের কাছেই টাকা। শুকতারা গভীর চিন্তায় পরে যায়। এই ভাতের হোটেলটা বড়ো করার স্বপ্ন শুকতারারও। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের টাকা নেই। কোনোদিন হবে এটাও মনে হয় না। মেয়েটার পড়ালেখার খরচও আছে। সেদিন তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে বাড়ি যায় সে। সাথে নিয়ে যায় ফজরের টাকার বান্ডিলগুলো। টাকার বান্ডিলগুলো বালিশের নিচে রেখে সে রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় শুকতারা। ঘুমানোর সাথে সাথেই সে চমৎকার একটি স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দূরে কোথাও ঘুরতে গেছে একা। সাথে একজন পুরুষ মানুষ। তার স্বামী নয়, অন্য কেউ। মুখের দিকে তাকাতেই শুকতারা চমকে ওঠে। ওর সাথে ফজর। কি আশ্চর্য! সে ফজরকে বলছে, আমার হাতটা একটু ধরেন, একা একা হাঁটতে ভালো লাগছে না। ফজর শুকতারার হাত ধরতে এগিয়ে আসে। মুখে পান চিবোচ্ছে। মুখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানের রস। এতেও ফজরকে খুব একটা খারাপ লাগছে না। মানুষটা বেশ রোমান্টিক।
সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলে যাওয়ার জন্য রেডি হয় শুকতারা। আজ একটু বেলা হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে এসে একবার ফজরের ঘরের দিকে উঁকি দেয়। না, ফজরকে দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিন তাকে এ সময় ঘরের সামনে বসে থাকতে দেখা যায়। শুকতারা যাওয়ার সময় ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। শুকতারা ফজরের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা ঠেলে ঢুকে যায়। শুকতারার মনে থাকে না এভাবে কারও ঘরে ঢোকা উচিত না। ফজর ঘুমিয়ে ছিল। দরজার খোলার শব্দে জেগে ওঠে। শুকতারাকে দেখে ফজর খুব একটা অবাক হয় না। কেবল পরনের লুঙ্গিটা ঠিক করে উঠে বসে। শুকতারা বিছানার দিকে একটু এগিয়ে যায়। কাপড়ের ভিতর রাখা গতকালের সেই বান্ডিলগুলো ফজরের হাতে দেয়। তারপর বলে, চল্, ভাতের হোটেলটা বড়ো করি! চাইরদিকে পাকা করা দরকার। বলেই ঘর থেকে বেড়িয়ে যায় শুকতারা। দ্রুত রান্না বসাতে হবে। হাঁসের ভুনা মাংস রাঁধতে হবে। আজ রাঁধলে এক বাটি ফজরের জন্য তুলে রাখবে বলে মনস্থির করে শুকতারা।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...