অর্ধাঙ্গিনী

মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন ইবনে মোস্তাফিজ

স্ত্রীকে বলা হয় স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী। এ উপমার ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর মায়া,
নিখুঁত ভালোবাসা আর ত্যাগের প্রতিচ্ছবি। একজন শ্রেষ্ঠ স্ত্রীর উপমা হতে পারে
সেই নারী, যিনি স্বামীর সুখ-দুঃখে সাথী হন, সংসারকে আপন করে গ্রহণ করেন এবং
নিজের সর্বস্ব দিয়ে পরিবারকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলেন। এ গল্পে আব্দুল্লাহ ও
সাদিয়া একটি স্বামী-স্ত্রী, দুইটি প্রাণ এক হৃদয়ের বাঁধনে আবদ্ধ।
সাদিয়া গ্রামের সাধারণ একটি মেয়ে। ছোটবেলা থেকে গ্রামেই বেড়ে উঠেছে, সরল-
সাদামাটা জীবনের ছোঁয়ায়। অন্যদিকে আব্দুল্লাহ, গ্রামের সন্তান হলেও বেড়ে
উঠেছে শহরে উঁচু দালানকোঠার মাঝে। শহরের আভিজাত্য ও গ্রামের সরলতার মাঝে
পার্থক্য ছিল, তবে হৃদয়ের টানে এ দুই জীবনকে মিলিয়ে দিতে চাইল নিয়তি।
আলি মুহাম্মদ, আব্দুল্লাহর বাবা, ছেলের জন্য পাত্রি খুঁজতে লাগলেন। একের পর
এক মেয়ের সাথে পরিচয় হলো, কিন্তু ছেলের মন যেন কোথাও বসলো না। বহু
খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে নজর পড়লো পাশের বাড়ির শরিফ উদ্দিনের মেয়ে সাদিয়ার
ওপর। মেয়েটি ছিল ভদ্র, গুণী ও নম্র স্বভাবের। এবারে আর আব্দুল্লাহর আপত্তি
রইলো না। পছন্দ হলো সাদিয়াকে।
অবশেষে জানুয়ারির ২৭ তারিখে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। বিয়ের পর থেকেই সাদিয়া
নিজের নতুন সংসারকে ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় গ্রহণ করলো। সে শুধু একজন
বউ হিসেবেই নয়, একজন দায়িত্বশীল গৃহিণী হিসেবেও দ্রুত প্রমাণ করলো তার
দক্ষতা। পরিবারের কেউ কখনও তার কাজে ত্রুটি খুঁজে পায়নি। রান্না-বান্না থেকে
শুরু করে সংসারের খুঁটিনাটি সবকিছুতে সাদিয়া ছিল পরিপূর্ণ যত্নবান।
সাদিয়া কখনো কারো মনে কষ্ট দেয়নি, আবার পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালনে
কোনো খুদ রাখেনি। স্বামীকে সম্মান করা, শ্বশুর-শাশুড়িকে আপন মা-বাবার মতো
যত্ন করা এবং সংসারের প্রতিটি কাজে মমতার ছোঁয়া রাখা ছিল তার জীবনের
মূলনীতি।
ঠিক তাই তো এমন গুণের অধিকারিণীকেই তো অর্ধাঙ্গিনী বলা যায়! এমনি এমনি
স্ত্রী অর্ধাঙ্গিনী হয়ে ওঠে না, ত্যাগ, মমতা আর ভালোবাসার অটুট বাঁধনই তাকে
সেই মহিমায় আসীন করে।
২২ বছরের দীর্ঘ সংসারের টানাপোড়েন, মায়া-মমতা আর ভালোবাসা ত্যাগ করে
অবশেষে তিনি ইহকাল ছেড়ে চলে গেলেন পরকালের পথে। এই দুই যুগের সংসার জীবনে
তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী হয়েছেন। প্রতিটি সন্তানের লালন-
পালনে তিনি যে অক্লান্ত শ্রম দিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

আমি তার স্বামী হিসেবে স্বীকার করছি, একজন স্ত্রী যতোটা কিছু তার স্বামীকে
দিতে পারে, তার সবটুকুই তিনি আমাকে দিয়েছেন। স্নেহ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা,
যত্ন কোনো কিছুরই অভাব রাখেননি তিনি। অথচ দুঃখের বিষয়, আমি স্বামীর
দায়িত্বের সবটুকু যথাযথভাবে পালন করতে পারিনি। এই আক্ষেপ আজীবন আমাকে
কষ্ট দেবে।
সাদিয়া আমার অর্ধাঙ্গিনী ছিল সত্যিকার অর্থেই ছিল। শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, বরং
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আমার অর্ধেক হয়ে থেকেছেন, আমাকে পূর্ণ
করেছেন। তার যত্ন, তার মমতা, তার ভালোবাসা এসব এতোটাই নিখাদ ছিল যে, আমি
যতদিন বাঁচবো, তার কোনো স্মৃতি ভুলতে পারবো না।
কথাগুলো বলতে বলতে আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। কান্না আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
খুব অল্প সময় আমরা একসাথে কাটিয়েছি বলে মনে হচ্ছে, অথচ সেই সময়ের
ভেতরেও আমি তাকে পুরোপুরি চিনতে পারিনি। আজ বুঝতে পারছি, সন্তানদের জন্য
কেমন মা হওয়া প্রয়োজন, সে তা নিজ হাতে শিখিয়ে গেছে। আর স্বামীর জন্য কেমন
স্ত্রী হওয়া উচিত, তাও দেখিয়ে গেছে সে নিজের জীবন দিয়ে।
আজ তাকে হারিয়ে আমি যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।
সংসার, সন্তান, সম্পর্ক সবকিছু থাকলেও মনে হচ্ছে হৃদয়ের অর্ধেক টুকরো
হারিয়ে গেছে। সাদিয়া ছিল আমার ভরসার জায়গা, আমার শক্তি, আমার শান্তির
আশ্রয়। আজ সে নেই তবু তার স্মৃতি, তার শিক্ষা, তার ভালোবাসা আমাকে আজীবন
পথ দেখাবে।
সাদিয়া অর্ধাঙ্গিনীর কথা মনে করে আব্দুল্লাহ প্রতিনিয়ত চোখের জল ফেলেন।
প্রতিটি মুহূর্তে তার অভাব তাকে শূন্যতায় ভরিয়ে তোলে। নামাজের পর মোনাজাতে
প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য দোয়া করতে ভুলেন না তিনি। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলেন, তুমি
আমার জন্য কি ছিলে, তা আমি ভালো করেই জানি। তোমার মতো করে আমাকে আর
কেউ কোনোদিন যত্ন করতে পারবে না। তুমি ছিলে আমার ভরসা, আমার শান্তি,
আমার সত্যিকারের অর্ধাঙ্গিনী। তোমার তুলনা হয় না, তুমি ছিলে অমূল্য সম্পদ।
আজ তুমি এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছো, কিন্তু আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন জান্নাতে
তোমাকে সুখ-শান্তিতে রাখেন। প্রিয়তমা, তুমি জান্নাতে সুখে থেকো, আর আমি
এখান থেকে তোমার জন্য দোয়া পাঠাতে থাকবো। তোমার স্মৃতি আমার অন্তরের
গভীরে অমর হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...