ভেলকি

প্রীতিদীপা দাশ

কার্তিকের মরা জল নামতে শুরু করলে কর্ণফুলীর খাঁড়িতে জেগে ওঠে থকথকে কালচে পলি আর পোড়া পাটের পচানি। উজান কারখানার বিষাক্ত ডিজেল আর বাসি ক্ষারের একটা তিতা কষা ঝাঁঝ থমকে থাকে নিস্তরঙ্গ ভোরের বাতাসে। নিশিকান্ত হাঁটু দুটোকে বুকের সাথে সাঁটিয়ে চেপে ধরে নদের পলিমাটিতে বসে থাকে, পরনের ময়লা ধুতিটার ভিজে পাড় মেটে পলিতে লেপটে একাকার। বুড়ো আঙুলের চেরা খাঁজে নোনা পলি শুকিয়ে নোনা চটা ধরে আছে, ঠিক যেন চামড়ার নিচে কেউ সূক্ষ্ম মেটে বালু পুরে দিয়েছে। ওপারে কারখানার ভারী বাঁশি বাজলে বাতাসের বুক চিরে কষা ধোঁয়ার চাদর নেমে আসে। হেমন্তের তীর্যক রোদ নদের নোনা কাদার ওপর পড়তেই বহুদূরের চরে ফুঁসে ওঠে এক চটচটে শ্বেত ঝিলিক। পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এই আলো নিশিকান্তের জোড়া চোখের মণি শুষে খেয়েছে।কার্তিকের এই মরা জলে রোদ পড়ে যে ঝিলিক উঠছে, তা নিশিকান্তকে ফিরিয়ে নেয় ৪৫ বছর আগের এক চৈত্রের খরাদগ্ধ দুপুরে;যেদিন সে স্ত্রীর শেষ রুপো বেচে জরিপের কাচ কিনেছিল। সে ভাটির ঘোলা জলটুকু হাঁটুর ওপর ঢেলে দিয়ে দূর চরের সেই রুপালি কাঁপনটার দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকে।

ভিটেয় যখন সে ফিরল, বাঁশবাগানের শুকনো পাতার ফাঁক গলিয়ে ভোরের শেষ রোদটা হেলে পড়েছে। উঠোন খাঁ খাঁ করছে। সতেরো বছর আগে নদীভাঙনের তোড়ে পচা খড়ম জোড়া উঠোনে ফেলে রেখে ছোট মেয়েটা কোন অচেনা সুড়ঙ্গের নৌকায় উঠে গিয়েছিল , সেই জায়গাটা এখন উইপোকার ঢিবিতে ঢাকা। দাওয়ার মরা বাঁশের কড়িকাঠ চেপে নিশিকান্ত হাঁপাতে হাঁপাতে বসে। ঘরের কোণে পড়ে থাকা পৈতৃক ভাঙা সিন্দুকটার গায়ে পুরু শ্যাওলার আস্তর জমে আছে। চালের ফুটো দিয়ে গলে পড়া আবছা আলোয় মেঝের কোণে রাখা বিলেতি কাচ চকচক করে। নদী জরিপ করার এই ধাতব যন্ত্রটা কিনতে গিয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে সে স্ত্রীর গলার শেষ রুপোর মলি দুটো হাটে বেচে দিয়েছিল। সে রাতে স্ত্রী এক ফোঁটা কাঁদেনি, উনুনের ধোঁয়ায় মুখ গুঁজে পচা আঁচলে চেপে রেখেছিল নিজের ফুসফুসের রক্তকাশি। নিশিকান্ত ধুতির শুকনো খাঁজ দিয়ে কাচের শ্যাওলা ঘষতে থাকে, কিন্তু কাচের দাগ একচুল নড়ে না, ভেতরে জমাট অন্ধকার যেমন ছিল তেমনই থেকে যায়।

পরদিন নদীর তলানি যখন আরও নিচে নেমে গিয়ে কালো পলি উন্মুক্ত করে দিল, নিশিকান্ত আর পাড়ে বসে রইল না। সে হাঁটু সমান তিতা পাঁকে পা নামিয়ে দিল। কাদার পেটে দেবে যাচ্ছিল তার রোগা তামাটে পা …তলদেশের মরা শেওলা সাপের থাবার মতো তার গোড়ালি পেঁচিয়ে ধরছিল, কিন্তু সে থামল না। হাত দুটোকে সামনে বাড়িয়ে শরীরটাকে টেনে টেনে সে নিয়ে চলল ওই শ্বেত দ্বীপের দিকে। পানি শেষ হয়ে মাটি ফুটতেই সে দুটো হাত বাড়িয়ে কাদা আঁকড়ে ধরল। তার বুড়ো আঙুল দুটো সোজা ঢুকে গেল চুন কারখানার বর্জ্য আর ফেনিল ক্ষারের ভেতরে। হাত ভর্তি হয়ে এল মিহি কাচের ছাই আর কোটি কোটি মরা ঝিনুকের চুরমার। কোনো উর্বর মাটি নেই, কোনো পারদের সিন্দুক নেই। কেবল মিলের ফেলে দেওয়া বিষাক্ত ক্ষার আর ছাইয়ের ভাগাড়।

জোয়ারের নোনা জলের প্রথম ধাক্কা চরের কূলে এসে পড়তেই সেই রূপালি আলোটা একলহমায় ঘোলা পানির তলানিতে হারিয়ে যায়। নিশিকান্ত কাদার কূলে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। তার দুই হাতের চামড়ার ভেতর বিঁধে গেছে ক্ষারের মিহি কাচের চুরমার। ক্ষত চুইয়ে রক্ত ফুটল না, কেবল বুড়ো আঙুলের চেরা খাঁজ দিয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে রাখা অন্ধ আঁশটুকু নদের নোনা জলে গলে চিরতরে ভেসে গেল।নদের তোড়ে কাদার বুক ছেড়ে রাত নেমে এলে কার্তিকের নোনা বাতাসে একধরনের ভারি নিস্তব্ধতা জমে ওঠে। জলের শব্দটা এখন আর গর্জন করে না, যেন খাঁড়ির পচা খাঁজে নিঃশব্দে ফুঁসে মরে। নিশিকান্ত কাদার ওপর উপুড় হয়ে পেটের তলে দুই হাত গুঁজে শুয়ে থাকে, তার পিঠের ওপর দিয়ে বয়ে যায় রাতের প্রথম ঠাণ্ডা বাতাস। বহুদূরে সারের কলের আবছা চিমনি থেকে উঠে আসা ধোঁয়ার লালচে আলোটা মেঘের পেটে থমকে আছে, কিন্তু নদের তলানি এখন ঘোর কালো, সেখানে আর কোনো রুপালি ঝিলিক নেই। পঁচিশ বছর আগে যেদিন তার পৈতৃক ভিটের শেষ কাঠটুকু নদী গিলে খেয়েছিল, সেদিনও রাতটা ছিল এমন থমকে থাকা কষা স্বাদের। পকেটে রাখা পেতলের জরিপের শিকটা কাদার তলানিতে ডুবে হারিয়ে গেছে, কিন্তু নিশিকান্ত সেটা খোঁজার জন্য হাত বাড়াল না, কারণ তার হাত দুটো এখন খাঁড়ির চটচটে কাদায় জড়িয়ে আঠা হয়ে আছে।

ভাটার পানি নেমে গিয়ে যখন ওপারে পলিমাটির ওপরে কেবল কিছু কড়ির খোলস আর মরা কাঁকড়ার ছাই ভেসে উঠল, নিশিকান্ত ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখ দুটো ঝাপসা, নোনা পলির চটা লেগে চোখের কোণে শুকনো আঁশ ফুটে আছে। সে বুঝল, সময় কখনো নদীর স্রোতের মতো ফিরে আসে না, কেবল কূল ভেঙে দিয়ে চলে যায়। যে সোনার ভূখণ্ডের আশায় সে সংসার, স্ত্রীর ওষুধ, আর মেয়ের শৈশবের হাসি বিক্রি করে দিয়েছিল, তা ছিল কেবল উজান পেপার মিলের ফেলে দেওয়া তিতা বর্জ্য আর দুপুরের রোদের ঝটকা । ভিটের ভাঙা কড়িকাঠের তলে জমাট বেঁধে থাকা ধূলোর মতো তার নিজের আয়ুটাও এখন নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে। সে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না, কেবল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে গালের নোনা পলিটুকু মুছতে চেষ্টা করল, কিন্তু শুকিয়ে যাওয়া মাটি তার চামড়া কামড়ে ধরে রইল।

শেষ রাতে যখন ভাটির জল পেরিয়ে উজান থেকে খেয়া নৌকার প্রদীপের আলো জলের বুকে ফেটে পড়তে লাগল, তখন নিশিকান্ত নদীর শেষ বাঁকের দিকে চেয়ে রইল। নৌকার সারেঙের হাঁক আর বইঠার ছপছপ শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে গেলে খাঁড়িটা আবার স্তব্ধ হয়ে গেল। নিশিকান্ত তার বুড়ো আঙুলের চেরা খাঁজে জড়িয়ে থাকা মিহি কাচের ছাইগুলো একে একে নদের জলে ধুয়ে ফেলতে চাইল, কিন্তু কাদার সাথে মিশে থাকা রাসায়নিক ক্ষার তার নখের মাংস ভেদ করে বসে আছে। সে আর ঘরের দিকে পা বাড়াল না, খাঁড়ির নোনা তলানিতে পিঠ ঠেকিয়ে আকাশের তারাগুলোর দিকে চেয়ে রইল। তারাগুলো কোনো স্বপ্ন দেখায় না, আলো ছড়ায় না, কেবল এক দূরবর্তী শূন্যতার সাক্ষী হয়ে অন্ধকার নদের বুকে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে।

ভোরের প্রথম হালকা আলো ফোটামাত্রই খাঁড়ির কালচে জলে ভেসে ওঠে নদের তলে জমে থাকা ভাঙা হাঁড়ি, পুরোনো জাল আর হাজারটা পোড়া কাচের গুঁড়ো। নদীর নোনা পাড় ছেড়ে নিশিকান্তের পা দুটো আর সামনের দিকে এগোতে চায় না। তার হাঁটুতে জমে থাকা থকথকে শুষ্ক কাদা এখন রোদের কড়া তাপে শক্ত চটা ধরে ফেটে গেছে। প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে গেলে মেটে পলির টানে তার পায়ের গোড়ালির ছাল ছিঁড়ে আসে। নদের পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মরা ছাতিম গাছটার দিকে সে চেয়ে থাকে, পঁচিশ বছর আগে এই গাছের ডালেই সে তার জরিপের প্রথম লাল কাপড়টা বেঁধেছিল। নদীর ওপারে কারখানার চিমনি থেকে নতুন করে আবার কালো ধোঁয়ার ধোঁয়াটে চাদর ছড়াতে শুরু করেছে। নিশিকান্ত তার ডান হাতের কনুই দিয়ে চোখ দুটো মুছে নেয়। চোখের কোনায় নোনা জলের শুকনো কাদা বিঁধে যায়। সে জানে, এই খাঁড়িতে কোনোদিন পলি জমবে না, কোনোদিন সোনার কাদা ফুটিয়ে নতুন ঘর তৈরি করা যাবে না, কেবল উজান কলের রাসায়নিক বিষ আর আলোর ভেলকি নদীর বুকে ছায়া ফেলে মানুষকে ভুলিয়ে নিয়ে যাবে মৃত্যুর কাছাকাছি।

উজান ঘাট থেকে কোনো এক সারেঙের কাঠের বৈঠার ছপছপ শব্দ ভেসে আসে। নিশিকান্ত ধীরে ধীরে ঘাটের ভাঙা ইটগুলোর ওপর নিজের ক্লান্ত শরীরটা সঁপে দেয়। ঠিক তার আট বছর পর, সতেরো বছর আগে, তার ছাগলছানা দুটোকেও এই খাঁড়ির পাড়েই এক রাতে ভেসে যেতে দেখেছিল সে, সেদিনও আকাশের রঙ ছিল এমনই পচা তামার মতো ফ্যাকাশে। তার পকেটের ভেতরে হাত চালালে আঙুলে কেবল ঠেকে কিছু শুকনো শ্যাওলা আর ভাঙা ঝিনুকের টুকরো। সে আর সিন্দুক খোলার জন্য ভিটেতে ফিরবে না, কারণ ঘরের সেই অন্ধকার আর সিন্দুকের শ্যাওলা পড়া কড়া দুটো তার অপহৃত যৌবনকেই প্রতি রাতে মুখ ভ্যাংচায়। নদীর নোনা তোড় ধীরে ধীরে আবার কূল ছোঁয়া শুরু করেছে। জোয়ারের ঘোলা জল এসে ভিজে যায় নিশিকান্তের নগ্ন পা, খাঁড়ির মেটে ক্ষার আর পচা কচুরিপানা তার পায়ের ফাঁকে এসে আটকে থাকে। সে স্থির চোখে চেয়ে থাকে নদের ওপারটার দিকে, যেখানে কার্তিকের তীক্ষ্ণ রোদ আবার নতুন করে একটি অলিক রূপালি রূপকথার চাদর বুনতে শুরু করেছে ।

দুপুরের কড়া রোদে নদীর খাঁড়িতে ভেসে ওঠা ওই ধাতব ঝলকানি আবার নতুন করে রূপ বুনতে থাকে। নিশিকান্ত তার ভিজা হাঁটুর ওপর চিবুক ঠেকিয়ে সেই মরীচিকার দিকে চেয়ে থাকে, তবে এবার আর তার হাত দুটো পিতলের শিকের দিকে বা নোনা বাটির দিকে এগোয় না। তার বুকের ভেতরে যে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশটা বছরের পথ চলার ক্লান্তি জমা হয়ে আছে, তা নদীর ঘোলা জলের তোড়ের চেয়েও বেশি ভারী। সে দেখে, নদীর ওপর দিয়ে একটা উজান খেয়া নৌকা ভেসে যাচ্ছে, নৌকার দাঁড়ের ছপছপ শব্দটা ভ্যাপসা বাতাসের বুকে ভেসে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরের কারখানাগুলোর তেতো ধোঁয়ার চাদরে।

নিশিকান্ত ধীরে ধীরে ভিটের দিকে ফিরে আসার জন্য এক পা বাড়ায়। পায়ের চেরা মাংসের ভেতরে খাঁড়ির নোনা পলি বিঁধে আছে, কিন্তু সেই ব্যথা এখন তার অনুভূতির বাইরে চলে গেছে। সে বোঝে, যে সোনাভাঙা কান্দার আশায় সে নিজের সমস্ত সংসার, স্ত্রীর আরোগ্য, মেয়ের মুখ আর যৌবনের আস্ত একটা জীবন নদের নোনা কাদার ওপর সঁপে দিয়েছিল, তা কোনোদিন মাটি ছিল না। তা ছিল কেবল উজান পেপার মিলের ফেলে দেওয়া তিতা ক্ষার আর কার্তিকের বাঁকা রোদের ফাঁদ।

ভিটেয় পৌঁছে সে শেষবারের মতো দাওয়ার ঘুণ ধরা বাঁশের খুঁটিটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। সিন্দুকের ঢাকনা খোলা হয় না, সেক্সট্যান্টের মরচে পড়া কাচ আর মোছা হয় না। সে দাওয়ার ঠান্ডা মাটির ওপর নিজেকে ছেড়ে দেয়। চালের ছিদ্র দিয়ে বিকেলের লালচে আলো এসে পড়ে তার শীর্ণ কপালের কড়া পড়া রগের ওপর। নদীর ওপারে আবার সারের কলের ভারী সিটি বাজল। বাতাস তেতো ধোঁয়ায় ভারী হয়ে এল। নিশিকান্ত চোখ দুটো বুজে ফেলে, আর সেই বন্ধ চোখের ওপারেও দেখতে পায়, নদীর ঘোলা জলের পেটে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে তার পঁয়তাল্লিশ বছরের কুড়িয়ে আনা সময়。

সন্ধ্যা নামার ঠিক মুখে নদের বাতাস যখন পুরোপুরি ঝিমিয়ে পড়ল, তখন ভিটের উঠোনে নেমে এল এক অদ্ভুত কুয়াশাটে নীরবতা। বাঁশবাগানের মরা ডালে বসে থাকা রাতচোরা পাখিটার ডাক বহু দূরে কারখানার সিটির কর্কশ আওয়াজে ঢাকা পড়ে যায়। নিশিকান্ত ভিটের মেঝেতে একপাশে কাঁধ ঠেকিয়ে শুয়ে থেকে ঘরের ছাদের দিকে চেয়ে থাকে। চালের ফুটো দিয়ে এতক্ষণ যে আলোটুকু ছিটকে এসে পড়েছিল তার বুকে, তা এখন মিলিয়ে গিয়ে কেবল এক চিলতে নিস্তেজ রঙা আঁধার ছড়াচ্ছে। সংসার শুরুর পর থেকে পঁয়তাল্লিশটা বছরের কত সহস্র কার্তিক, বৈশাখ আর শ্রাবণ যে এই ভিটের দাওয়ায় বসে তার চোখ চুষে খেল, তার কোনো লিখিত হিসাব নেই। ঘরের কোণে রাখা পুরোনো সিন্দুকটার কাঠের পচন থেকে আসা কটু গন্ধটা তার নাকের ভেতর সেঁধিয়ে যায়। এই সিন্দুকে কোনোদিন সোনার মোহর জমানো হয়নি, কোনো পৈতৃক ধনরত্ন রক্ষিত ছিল না, কেবল ছিল কাদাজলের হিসাবের কিছু ছেঁড়া কাগজ আর স্ত্রীর বিয়ের সময়ের একজোড়া হাতির দাঁতের পচে যাওয়া চিরুনি। নিশিকান্ত তার শীর্ণ হাতটা মেঝের দিকে বাড়িয়ে সেই পৈতৃক সিন্দুকটার গায়ে কেবল বুড়ো আঙুলের আলতো ছোঁয়া রেখে দিল। কাঠের ওপর জমানো শ্যাওলা তার আঙুলের খাঁজে হিম হয়ে বসে গেল। নদীর তোড়ে হারানো যৌবনের মতোই ঘরের প্রতিটি কাঠ এখন ক্ষয়ে গিয়ে উইপোকার বিষ্ঠায় পরিণত হয়েছে।

রাত যত গভীর হতে থাকে, খাঁড়ির জলের তোড় ততই বাড়ে। জোয়ারের নোনা পানি এসে ঘাটের শেষ ভাঙা ইটটাকেও ডুবিয়ে দিতে শুরু করে। নিশিকান্ত ঘরের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে শ্বাস টানে। তার মনে হতে থাকে, নদের ওপারে কারখানার রাসায়নিক ছাইয়ের ওপর জমে থাকা সেই অলিক সাদা আলোর রূপকথাটা যেন কেবল তার জীবনের মরীচিকা ছিল না, তা ছিল এক অমোঘ ফাঁদ, যা থেকে কোনো মানুষই জীবদ্দশায় মুক্ত হতে পারে না। সে চোখ বোজে, আর নদের জল ধীরে ধীরে তার ভিটের কূল ছুঁয়ে ভেসে চলে যায় এক অসীম শূন্যতার পানে।

ভোরের প্রথম ঝাপসা কুয়াশা কাটতেই নদের ধোঁয়াটে রূপটা ধীরে ধীরে ধরা দেয়। জোয়ারের ঘোলা জল নামতে নামতে খাঁড়ির তলানিতে জমা থাকা পচা পাটের আঁশ আর কাচের চুরমার পুরোপুরি নাঙা হয়ে পড়ে। নিশিকান্ত দাওয়ার ওপর শুয়ে থেকেই নদের শেষ পাড়ের দিকে চোখ রাখে। তার শরীরের চামড়া এখন ভিটের শুষ্ক বাঁশের মতো খসখসে, আর গায়ের ধুতিতে লেপটে থাকা কাদা শুকিয়ে শক্ত শক্ত চটা ধরেছে। বহুদূরের ডকইয়ার্ড থেকে আসা লোহা কাটার কর্কশ আওয়াজ বাতাসের বুক চিরে তার কানে এসে বাজে। সে হাত দুটোকে বুকের ওপর শক্ত করে চেপে ধরে নিঃশ্বাস টানে, কিন্তু ফুসফুসে কেবল সেঁধিয়ে যায় নদীর বিষাক্ত পোড়া মবিলের তিতা গন্ধ।

পঁয়তাল্লিশ বছর আগে সে যখন এই ভিটেতে প্রথম খুঁটি পুঁতেছিল, তখন নদীর ওপারে কোনো কারখানার চিমনি ছিল না, ছিল কেবল মাইলের পর মাইল বিস্তৃত নোনা ঘাসের চর। কিন্তু নদীর ওপারে কেমিক্যাল মিল ওঠার পর থেকেই রোদে সেই রাসায়নিকের ছাই আর বর্জ্যের ওপর এক মায়াবী শ্বেতঝিলিক ফুটতে শুরু করে। সেই ঝিলিককে অমূল্য পারদ ভেবে সে জরিপের তামার কল কিনেছিল, ভিটের জমি বিক্রি করেছিল, স্ত্রীকে উনুনের কাশির ধোঁয়ায় ফেলে রেখে নদের নোনা কাদায় দিনরাত সাঁতার কেটেছিল। আজ সেই সব অলিক স্বপ্নের চরম অবসান ঘটল। দুপুরবেলা সূর্য যখন মাঝআকাশে উঠে চরের সমস্ত জল শুষে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই নিশিকান্তের বুজে আসা চোখের পাতাও শেষবারের মতো স্থির হয়ে গেল। আর কোনো মরীচিকা তাকে ডাকবে না, কোনো নদীর তোড় তাকে বিভ্রান্ত করবে না। খাঁড়ির নোনা হাওয়া ধীরে ধীরে মিশে গেল তার নিভে আসা শেষ নিঃশ্বাসের সাথে, আর নদের কালো পানি নিঃশব্দে বয়ে চলল এক অসীম ভুলের স্মারক বয়ে নিয়ে।

পরদিন কার্তিকের নোনতা কুয়াশা কেটে ভাটির নদী যখন আবার ধীর পায়ে ওপারে নেমে গেল, ততক্ষণে ভিটের পুরোনো দাওয়ায় নিশিকান্তের নিথর শরীর ঘেঁষে একঝাঁক লাল কাঁকড়া পলি খুঁড়তে শুরু করেছে। উজান কলের বাঁশি যথারীতি কর্কশ সুরে ভোরের নিস্তব্ধতা চিরে মেটে আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠে, আর কার্তিকের কাঁচা রোদ তেতে উঠে ওপারের সারের বর্জ্যে বুনে দেয় সেই চটচটে রূপালি মরীচিকার জাল। নদের কূল ভেঙে পলি সরে যায়, পুরোনো ঘর উইপোকার বিষ্ঠায় হারিয়ে যায়, কিন্তু নদীর বিষাক্ত ক্ষারে জ্বলে ওঠা অলিক শ্বেত ঝিলিক একবিন্দু ফিকে হয় না। নিশিকান্তের পকেটের সেই মরচে ধরা পেতলের জরিপের কাটা শিকটা চরের মেটে পলিতে অর্ধেক ডুবে রোদ আটকে এক অন্ধ দর্পণের মতো চেয়ে থাকে, যেন উজান থেকে ভেসে আসা মিথ্যা আশার মরীচিকা যুগে যুগে নতুন কোনো পথভোলা মানুষকে নিঃশব্দে গিলে খাওয়ার জন্য আবার নতুন ফাঁদ পেতে বসে আছে।

আরও পড়ুন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

0
হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

আরও পড়তে পারেন

তুমি মেঘ হয়ে এসো

হাসান মাহমুদ চৈত্রের দাবদাহে ঝলসে যায় গাঙচিলের দুটি ডানা, পুড়ছে ধরিত্রী ভীষণ খরায় তোমার আছে কী জানা? মরুময় শুকনো খাল-বিল বিবর্ণ পাতারা ঝরে পড়ে আজও তৃষ্ণার্ত আবাবিল ডাকে তোমায় স্বকাতরে। ফেঁটে চৌচির ফসলের...

অক্টোবর রেইন

জান্নাতুল ফেরদৌস সামিয়া অক্টোবরের প্রথম বৃষ্টি। বাতাসে হালকা শীতের গন্ধ। প্রিয় রঙের 'আধাভাঙা সৈনিক'টাকে প্রতিদিনের মতো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। সৈনিক বলতে ছাতা। ওর দুটো শিক...

নীল দরজা

 সায়মা বিনতে ইসমাইল বাড়িটায় প্রথম রাতেই আমি বুঝেছিলাম, কিছু একটা ঠিক নেই। অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুরোনো বাড়ি হলে শব্দ হবেই - কাঠের দরজা কড়কড় করবে, জানালায়...