কাশফিয়া নাহিয়ান
এই দেখো… প্রজাপতি গুলো কত সুন্দর! একবার ছুঁয়ে দেখো… অনুভব করো চারপাশের মাদকতা…
কাট ইট…এক্সিলেন্ট শর্ট…তনিমা আর দুটো সিন আছে..এরপরই প্যাকআপ।
জ্বী…ঠিক আছে…
আরে কি হলো? চেয়ারে এভাবে বসে পড়লে যে…শরীর ঠিক আছে তো?
না…আমি ঠিক আছি।মাথাটা একটু ঘুরে গিয়েছিলো…
ও…আমি বলি কি তনিমা তুমি না হয় আজ রেস্ট করো।বাকি শ্যুট কাল করি…
না..আমি পারবো…
না না তনিমা… হেলথ নিয়ে কোনো কম্প্রমাইজ নয়।যাও বাড়ি যাও রেস্ট করো…
ওকে…
তনিমা রহমান।এ যুগের নামকরা অভিনেত্রী মডেল।সবাই তাকে এক নামে চেনে। আজকাল তার হাতে অনেক কাজ।তাই শরীরের দিকে খেয়ালই নেই তার…সবসময় ফটোশুট,একটিং নিয়েই ব্যস্ত সে… তনিমার লো বিপি আছে।তাই মাঝে মাঝেই মাথাটা ঘুরে যায়…
কি ব্যাপার? আজও বসে আছো?
তুমি তো জানো আমি তোমারই অপেক্ষায় থাকি
কেন থাকো?
তোমাকে ভালোবাসি…তাই…
সত্যি…
একশত ভাগ সত্যি…এখন যাও…ফ্রেশ হয়ে এসো।খাবারটা তো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে…
তনিমা আর সীমান্তের বিয়ে হয়েছে তিন বছর।তাদের প্রেমের বিয়ে। দুজনেরই বাবা মা এখনও তাদের মেনে নেয়নি…কারণ তনিমার একটিং মডেলিং…ঘরের বউ ঘরে থাকবে এটাই তারা চেয়েছিলো। কিন্তু তনিমা সীমান্ত কেউই রাজী হয়নি।অন্যদিকে সীমান্ত স্ট্রাগলিং রাইটার।তার লেখা প্রথম দুটো বই পাঠক মহলে সাড়া ফেললেও পরের বইগুলো আর সেই ভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি।কোনো বাবা মাই চায় না একজন অসফল মানুষের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে।তাই তারা নিজেরা আলাদা ফ্ল্যাটে থাকছে। সীমান্ত অবসন্নতায় ভোগে…যদিও তনিমা তাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে তবুও এক অসীম শূন্যতায় সে হারিয়ে যাচ্ছে… মনে হয় চারিদিক থেকে সে রিক্ত, শূন্য… জীবনের আর কোনো মানে নেই…
আমি কি ছোট বাচ্চা যে এভাবে আমাকে খাইয়ে দাও?
নিজে রান্না করতে পারি আর তোমাকে খাইয়ে দিতে পারবো না…কি যে বলো না তুমি?
আজ কিছু লিখলে?
না…মাথায় কিছু আসেনি…
সীমান্ত তুমি কি আমায় কিছু বলতে চাও?
যেমন…
যেমন…এমন কোনো কথা যেটা তুমি আমায় বলতে পারছো না…যেটা তোমাকে ভিতরে ভিতরে কষ্ট দিচ্ছে…
না… তনিমা…এমন কোনো কথা বলার নেই।হেয়ালী না করে চুপচাপ খাও তো…
আজ রান্না কেমন হয়েছে?
ফাটাফাটি…
এভাবেই চলছিলো তাদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু হঠাৎ একদিন তনিমা শুটিং স্পটে সেন্সলেস হয়ে যায়।তাকে দ্রুত হসপিটালে নেয়া হয়…
কি হয়েছে ডক্টর… তনিমা ঠিক আছে তো?
নো…মিঃ সীমান্ত… কিছুই ঠিক নেই
মানে?
মানে ওনার বডিতে বিষ পাওয়া গেছে…
কি বলছেন এসব…
জ্বী…আমি ঠিকই বলছি।ওনাকে স্লো পয়জন করা হয়েছে…মানে একটু একটু করে বিষ ওনার শরীরে ইনজেক্ট করা হয়েছে…
তনিমা ঠিক হয়ে যাবে তো? কাঁদতে কাঁদতে বললো সীমান্ত…
এখনই কিছু বলতে পারছি না…উনি অনেক ক্রিটিক্যাল। প্রার্থনা করুন।আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করবো।
মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে গেলো তনিমা রহমান অসুস্থ। ডিরেক্টর প্রডিউসার সাংবাদিক ভক্ত অনুরাগীরা সবাই হাসপাতালে ভিড় জমালো…কান্নাকাটিতে ভারী হয়ে গেলো পরিবেশ… সবার মনে একটাই প্রশ্ন তনিমাকে বিষ কে দিলো?
সবাই সীমান্তকে সমবেদনা জানাচ্ছে যে সব ঠিক হয়ে যাবে…সীমান্তেরও পাগলপ্রায় অবস্থা… কিন্তু তার ঠোঁটে এক ক্রুর হাসি বিদ্যমান…যেটা কেউ খেয়াল করছে না…কারণ বিষটা আর কেউ নয় সীমান্তই তনিমাকে দিয়েছে…প্রতিদিন নিজের রান্না করা খাবারের সাথে মিশিয়ে…নিজ হাতে তাকে খাইয়েছে…অসহ্য লাগছিলো তনিমার স্টারডম পপুলারিটি..জাস্ট নেয়া যাচ্ছিলো না…প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও পরে সেটা চোখের বালি হয়ে গিয়েছিলো। সবাই তাকে তনিমার হাজবেন্ড হিসেবেই চেনে… সীমান্ত হিসেবে নয়… বিষয়টা তার কাছে কাটার মত বিঁধছিলো…এও কি মেনে নেয়া যায়?তাই সে প্ল্যান করেছিলো ধীরে ধীরে তনিমা কে শেষ করে দেবে… কেউ তাকে সন্দেহ করবে না…কারণ সে তো তনিমাকে নিজের প্রাণের চাইতেও বেশী ভালোবাসে…অন্তত সবাই তো তাই জানে…সে তো সো কল্ড পত্নিব্রতা পতি…
বাসায় এসে সোফায় গা এলিয়ে দিলো সীমান্ত।আজ সে বেশ খুশি। এতদিন পর তার এত ভালো লাগছে…যদিও হসপিটালে সবার সামনে একজন প্রেমিক হাজবেন্ডের একটিং করতে করতে বোর হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু এখন বেশ লাগছে…যদিও অভিনয় সে ভালোই করে।একটিং কে প্রফেশন হিসেবে নিলে মন্দ হতো না…
তনিমা এক গ্লাস…
কি করছে সে? তনিমা তো হসপিটালে… নিজের উপরই হেসে ফেললো…আর যাই হোক স্ত্রী হিসেবে একদম পারফেক্ট ছিলো তনিমা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই যে তোমার জুস… বাইরে থেকে এসে জুস না খেলে তো তোমার চলে না…
ত…নি…মা.. তুমি?চমকে উঠলো সীমান্ত…
হ্যা…আমি..এত অবাক হওয়ার কি আছে?
তুমি তো হসপিটালে ছিলে…ডক্টর বললো তুমি ক্রিটিক্যাল…
আরে…আমার কিছুই হয়নি…এটা তো ছিলো একটা পাবলিসিটি স্টান্ট…
কি…
হ্যা…কেন তুমি জানো না বুঝি আমাদের মানে এক্টরদের এসব ছোটখাটো রিস্ক নিতে হয় পাবলিকদের এটেনশন পাওয়ার জন্য।এসব তুমি বুঝবে না।এগুলো এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির স্ট্যাট্রিজি…সো জাস্ট চিল…
কিন্তু…
তুমি ছাড়ো তো এসব…আজ আমি তোমার জন্য রান্না করবো…
না..না… তুমি কেন করবে?
কেন… আমি কি ভালো রাঁধতে পারি না…
না…তা কেন হবে?
তুমি বসো তো সীমান্ত…আমি ঝটপট রান্নাটা সেরে আসছি…
সীমান্ত রাগে গজগজ করতে লাগলো। কতদিন পর একটু খুশি হয়েছিলো সে…সেটাও আর দীর্ঘস্থায়ী হলো না…
কিছুক্ষণ পর…
এই নাও তোমার ফেবারিট চাইনিজ…
এত কিছু…এত কম সময়ে…কি করে?
কি করে আবার? তোমার ভালোবাসার ছোঁয়ায়…আসলে তোমার ভালোবাসা সবকিছু সহজ করে দেয়… দাঁড়াও…আজ আমি তোমাকে খাইয়ে দিবো…
না…না..
না.. না.. করছো কেন?সবসময় তো তুমিই আমাকে খাইয়ে দাও…আজ না হয় আমি দিলাম সমস্যা কি? তুমি জানো আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।সবসময় সর্বক্ষণ প্রতিমুহূর্ত থেকো আমারই…
মানে…
কিছু না…
সীমান্ত আর কথা বাড়ালো না… চুপচাপ তনিমার হাত থেকে খাবার খেয়ে নিলো…আর খাবারটা এত সুস্বাদু ছিলো যে বলার মত না…
খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলো সীমান্ত… হঠাৎ তার মোবাইলে একটি কল আসলো…
হ্যালো…
জ্বী…আপনি কি মিঃ সীমান্ত বলছেন…
জ্বী…বলছি… আমি হসপিটাল থেকে বলছি… আপনার স্ত্রী তনিমা কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন…
কি? এসব আপনি কি বলছেন…
সরি…আমরা শত চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারিনি…
মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেলো সীমান্তর…ভয়ে আতঙ্কে ঘামছে সে…
তনিমা… তনিমা…করে চিৎকার করতে লাগলো সে… কিন্তু তনিমা কোথাও নেই…
পরদিন সীমান্তর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
মেঝেতে পড়ে ছিলো একটি ডায়েরী… সেখানে শুধু একটি কথাই লেখা ছিলো আর তা হলো “থেকো আমারই”…








